কবি শামসুর রাহমানের শিশু সাহিত্য

কবি শামসুর রাহমানের শিশু সাহিত্য

আরিফ চৌধুরী

সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের সামাজিক রাজনৈতিক প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। রাজনৈতিক ধারার মতো সাহিত্যের পরিবর্তিত রুপ লাভ করে সামাজিক অবস্থার পরিবেশ ও প্রতিবেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহমান ধারায়।  একটি দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, প্রাকৃতিক পরিবেশ, লৌকিক ঐতিহ্যে, সৌন্দর্য্যবোধ, স্বপ্ন-কল্পনা, ও সুখ-দু:খের বিচিত্র রুপ বৈচিত্র্যতা ফুটে উঠে কবিদের সাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। মাটি, মানুষ, দেশকাল, সকল কিছুর অনূভুতি ও মানবিক রুপ কবিদের কাছে লেখার পটভূমি হিসাবে কাজ করে। কবিরা সর্বদা অনূভুতিপ্রবণ ও আবেগময় বলেই সকল সামাজিক ক্রিয়া তাদের চেতনায় নানা রুপ শৈলিতে নান্দনিকতা লাভ করে। নিজ দেশের পরিমন্ডলে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার চিত্ররুপ কবির মনে সর্বদা ছায়া ফেলে বলেই কবিরা স্বদেশ লৌকজ ও ঐতিহ্যে মূল্যবোধ ধারণ করেন, তেমনিভাবে প্রধান কবি শামসুর রাহমানের অনুপম রচনার অজস্র ধারায় তিনি সাহিত্যকে যেমনিভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তেমনিভাবে কবিতার পাশাপাশি স্মৃতিচারণ ও শিশুতোষ রচনায় তার উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রোজ্জ্বল। তার  ছড়ায় উঠে এসেছে স্বদেশ চেতনা, মাটি, মানুষ, ফুল, পাখি, নদী, ও মুক্ত আকাশ, স্বদেশের ভুমি, পাহাড়, প্রকৃতির রুপ, ও শিশুতোষ ভাবনা জগতের চিত্রাবলী। সাহিত্য চর্চার পথ ধরে তিনি ছড়ায়, কবিতায়, ছন্দের ব্যবহার করেছেন সহজ সরল ও মৌলিকতায়।

কবি শামসুর রাহমানের ছড়া লেখা শুরু হয় সাহিত্য চর্চার এক যুগ পরে ষাট দশকের শুরুতে। ষাট দশকের সেই সময়ে শিশুদের নিয়ে লেখালেখির ভাবনা তার মধ্যে কাজ করতে থাকে। তার প্রকাশিত শিশু কিশোরদের নিয়ে প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই- এলাটিং বেলাটিং প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। এই ছড়া গ্রন্থটি প্রকাশের পর পরই শামসুর রাহমানের ছড়া সাহিত্য এক নতুন মাত্রার সূচনা করেন এবং দেখতে দেখতে খুব কম সময়ে তিনি পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন।  তারপর আরও দুটো ছড়ার বই – ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো ও গোলাপ ফোটে খুকির হাতে প্রকাশিত হলে ছড়া সাহিত্যের অন্যতম আরেক রুপকার হিসাবে অনিবার্য হয়ে উঠেন তিনি। ইতিমধ্যে তার ছেলেবেলার দুরন্ত সময়ের  কিশোর স্মৃতিচারণমূলক রচনা -স্মৃতির শহর প্রকাশিত হলে সবার মাঝে শামসুর রাহমান নতুন ভাবে পরিচিত লাভ করতে থাকেন। এটি মূলত  কবির শৈশব স্মৃতি ও ঢাকা নগরীর উপাখ্যান যা -টাপুর টুপুর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে সকল শ্রেণির পাঠকদের মন হরণ করে যা বই আকারে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো শিশু সাহিত্য বিতান, চট্টগ্রাম থেকে। এটি আমাদের শিশু সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। এ ছাড়াও জীবদ্দশায় অর্ধ ডজন ছড়ার বই শিশু কিশোরদের উপহার দেন শামসুর রাহমান। তার মধ্যে ঊল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো- এলাটিং বেলাটিং, রংধনু সাঁকো, লাল ফুলকির ছড়া, নয়নার জন্য, আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি,  নয়নার জন্য গোলাপ, চাঁদ জেগেছে নদীর বুকে ও শামসুর রাহমানের ছড়া সমগ্র সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। শামসুর রাহমান নিজের ছড়া সমদ্ধে অকপটে বলেছেন- ছড়ার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিন পরে, যখন একটু বড় হয়েছি। ছেলেবেলায় যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ছোটদের লেখা হাসিখুশি বইটিতে হারাধনের দশটি ছেলে বিষয়ে একটি ছড়া পড়েছিলাম। তখন মনে পড়ে কেমন করেছিলো ছেলেবেলার জন্য। একটু বড় হতেই কত যে লোকজ ছড়া, ছেলেভোলানো ছড়া, রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, অবনীন্দ্রনাথ ,অন্নদা শংকর রায়, লীলা মজুমদার, আরো অনেকের ছড়া পড়েছি আপন মনে। তখন থেকে ছড়া লেখার প্রতি আমার আগ্রহ। ছড়া লেখার মধ্যে দিয়ে অনেক সময় সাম্প্রতিক সময়ের ছড়া আমার মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। শুধু বাস্তব ঘটনাবলীই আমার ছড়ার বিষয় হয়ে উঠেনি কল্পনার রাজ্য বিচরণ করা অনেক কথাও আমার ছড়ায় উঠে এসেছে।

শামসুর রাহমানের ছড়ার বিষয়বস্তু দেশ, মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, নদী, ফুলপাখিদের নিয়ে। সমাজের বাস্তবতা, শিশুকিশোরদের মন ভোলানো স্বপ্নরাজ্য, রাজপুত্রের গল্প, স্বদেশপ্রেম, ও সমাজের নানান অসংগতির বিষয়াবলী নিয়ে তার ছড়ার সংখ্যা কম নয়।আমাদের স্বাধীকার অন্দোলন, মহান ভাষা অন্দোলন, ও মুক্তি সংগ্রাম, ও দেশ মাতৃকার অভাবনীয় কষ্ট তার ছড়ায় উঠে এসেছে স্বদেশ প্রেমের চেতনায়। যেমন-

আজকে আমি বলবো শুধু

যুদ্ধ জয়ের কথা

যার সুবাদে পেয়ে গেছি

সাধের স্বাধীনতা।

যাদু বলে নয়কো মোটে,

নয়কো সহজ পথে

স্বাধীনতা এলো জানি

রক্তমাখা রথে।

স্বাধীনতার শত্রু য়ারা

তাদের পায়া ভারি,

এসো, সবাই মিলে ওদের

তাড়াই তাড়াতাড়ি।

নইলে বাগান উজাড় হবে

ফুটবে নাকো ফুল,

এক নিমিষে উজাড় হবে

ক্ষীর নদীর কূল।

(যুদ্ধ জয়ের কথা- শামসুর রাহমান)

আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। পেয়েছি আমাদের গর্বিত জাতীর পতাকা। সেই স্বাধীনতা অর্জনে বীর বাঙালি মুক্তিসেনার দল যে আত্মত্যাগের মহীমার মধ্য দিয়ে শত্রু সেনাকে কাবু করে বিজয় ফিরিয়ে এনেছে। সেই বিজয়ের উল্লাস ও আনন্দকে ধারণ করে শামসুর রাহমান লিখেছেন-টুকটুকে লাল স্বাধীনতা নামক অসাধারণ পঙক্তিমালায় অনবদ্য ছড়া। যেমন-

শত্রু সেনা বাংলা জুড়ে

ক্ষণে  ক্ষণে জুলুম করে,

শহর এবং গ্রাম পোড়ালো

লাশ সাজালো থরে থরে।

তাই-না দেখে বীর বাঙালি

বন-বাদড়ে, মাঠে লড়ে।

মুক্তিসেনার দীপ্ত চোখে

প্রতিশোধের আগুন ঝরে।

মুক্তি সেনা অস্ত্র হাতে

শত্রু দুর্গে ঝাপিয়ে পড়ে

শত্রু ওড়ে ঝড়ের মতো

বুক কাঁপানো তুমুল ঝরে।

অত্যাচারি শত্রু সেনা

যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পরে

টুকটুকে লাল স্বাধীনতা

এলো সবার সুখের ঘরে।

(টুকটুকে লাল স্বাধীনতা- শামসুর রাহমান)

শিশু কিশোরদের মনোজগতের মাঝে নিবিষ্ট হয়ে শিশুদের রুপকথার গল্প, দৈত্যরাজ ও রাজকুমারের গল্প,পরীদের দেশের গল্প শোনানো প্রভৃতি মনোজগতের ভাব মানবিক চেতনায় ধারণ করে শিশুদের মনোজগতের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টির প্রয়াসে শামসুর রাহমান ছড়ায় সহজ সরল ভাষায় রুপকথার গল্প করেছেন শিশুদের মনোজগতকে নতুন ভাবনায় উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে নিয়ে। যেমন-

জল টুপটুপ দীঘির পাড়ে ডালিম গাছের ডাল

ডালিম গাছে জল ঢেলেছে খুকু মণি কাল।

তোতা পাখি লেজ নাচাল, ডালিম গাছে মৌ

হঠাৎ দেখি ডুব দিয়েছে লাল শালিকের বৌ।

লাল শালিকের বৌ এর মাথায় মুক্তো জমে ঐ

মুক্তো নিল হাওয়ার রাজা, আমরা চেয়ে রই।

(জল টুপটুপ/ শামসুর রাহমান)

সমাজের ঘটে যাওয়া নানান অসংগতির চিত্রাবলি, পরিবেশের বৈচিত্র্যময়তা, পরিবর্তন, শিশুদের মন ভোলানো জগতে কল্পনার রাজ্য, ভুত, পরী, ও দৈত্যের দেশের গল্প, সমাজের নানান টানাপোড়েন, সহজ সরল ভাষায় তুলে আনার দক্ষতায় ও নির্মাণে শামসুর রাহমান ছিলেন সদা সচেতন। এক রুপকথার রাজ্যের জীবন যাপনের অসংগতির চিত্র আঁকতে তিনি বলেছেন এক মিষ্টি ছড়া।যেমন-

আজব দেশের ধন্য রাজা

দেশ জোড়া তার নাম

বসলে বলেন হাঁটরে তোরা

চললে বলেন থাম।

রাজ্য ছিলো সান্ত্রি সিপাই

মন্ত্রি কয়েক জোড়া।

হাতি শালে হাতি ছিল

ঘোড়াশালে ঘোড়া

গাছের ডালে শুক- সারিদের

গল্প ছিল কত,

গল্পে তাদের রাজার কথা

ফুটতো খইয়ের মতো।

(রুপকথা/শামসুর রাহমান)

শামসুর রাহমান ছড়ায় শিশুদের মনোজগতকে নাড়া দিয়ে যায় এমন শব্দ, ছন্দ, ও ভাষার রুপায়নে শিশুদের মনে খুব সহজেই দোলা দিয়ে যায়। তাইতো তার ছড়া পাঠকের কাছে পোঁছাতে পেরেছে ছন্দের কারুকার্যে। তার ছড়া সকল শ্রেণির পাঠককে ও পাঠকের মনকে দোলা দিয়ে যায় অনায়াসেই।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও নিজস্ব কাব্য সত্বার অধিকারী কবিদের একজন শামসুর রাহমান জন্মেছিলেন ঢাকার মাহুতটুলিতে ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর। আদিনিবাস নরসিংদির রায়পুর উপজেলার পাড়াতলি গ্রামে।

বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় বিচরণের মতো ছড়া সাহিত্যে শামসুর রাহমানের অবদান অসাধারণ মহিমায় অম্লান। তার ছড়া সমাজচিন্তা, স্বদেশ ভাবনা, শিশুদের মনো জগতের ভাবনার কথা উঠে এসেছে অনায়াস্ইে। সহজ সরল ভাষার রীতিতে ছন্দের মাধুর্য্যতায় সৌন্দয্যের অন্বেষা সৃস্টির সমান্তরালে মাটি ও মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা তার সৃষ্টির সম্ভারকে করেছে আলোকিত। আমাদের দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মতো তার ছড়া সকল সময়ে ভাঙাগড়ার দিনগুলোতে সমকালীন সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে, থাকবে চিরকাল

লেখাপাঠান- bakumbak71@gmail.com

এসবিসি/ওএস/এসবি