রাজনীতিকের চরিত্রহনন : দায় কার

রাজনীতিকের চরিত্রহনন : দায় কার

এডভোকেট নূরজাহান বেগম মুক্তা : আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ কারো দানে পাওয়া নয়। লাখো লাখো শহীদের রক্তে আর মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশ নিরন্তর এগিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে বিদ্যুৎ আর উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছে দেশ। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেশকে নতুন উচ্চতায় আসীন করেছে। বিশ্ব নেতৃত্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এখন পৃথিবীর অনেক দেশের কাছে উন্নয়নের মডেল বাংলাদেশ। দেশের উন্নয়নে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাশাপাশি অবদান রয়েছে রাজনীতিবিদদেরও। কিন্তু দুঃখের ও পরিতাপের বিষয় এই যে, রাজনীতিবিদরাই এ দেশে সবচেয়ে বড় বেশি সমালোচিত হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন। সেই কষ্ট থেকে অভিমানে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন, এমনকি অনেকে পৃথিবী ছেড়েও গেছেন।

বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছুঁই ছুঁই করছে। ধারাবাহিকভাবে এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সবাই বলছে অসাধারণ একসময় পার করছে বাংলাদেশ। রপ্তানি আয় ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ছে প্রতিনিয়তই। বিশ্বের বুকে পোশাক খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে, সে বিষয়ে কেউ এখনো কোনো সংশয় প্রকাশ করেননি। বিষয়টি আমাদের জাতির জীবনে খুবই আনন্দের ও সুখের। আর সেই সুখের নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন রাজনীতিবিদসহ অনেকেই। তবে মুখ্য ভূমিকাটা পালন করছেন রাজনীতিবিদরাই। তবুও তাদের নিয়ে চলছে নানা ধরনের বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড়। প্রতিনিয়তই তাদের ত-বিত হতে হচ্ছে বিভিন্ন আক্রমণে। মিডিয়া থেকে শুরু করে সবখানেই রাজনীতিবিদদের প্রতি আক্রোশ দেখা যায়। কোনো বিষয়ে পুরোপুরি না জেনেই আক্রমণ করা হচ্ছে রাজনীতিবিদদের। তাদের চরিত্রের ওপর কলঙ্ক লেপন করা হচ্ছে। আর সেই কলঙ্কের জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে অভিমান নিয়ে রাজনীতিকে বিদায় জানাচ্ছেন।

কিন্তু একজন রাজনীতিবিদকে রাজনীতিবিদ হতে কী পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, সেটা নিয়ে কেউ ভাবেন না। ভাবতে অবাক ও কষ্ট লাগে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশকে যখন অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রস্তুত করছিলেন, তখনই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একজন মহানায়ককে পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করা হয়, সেটি ছিল আমাদের জাতির পিছিয়ে পড়ার প্রথম ধাপ। এরপর থেকেই শুরু হয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। দেশের উন্নয়ন তো তারা করেননিই, দেশকে পিছিয়ে নেওয়ার নীলনকশা বাস্তবায়ন করে গেছেন নিরন্তর। সেখান থেকেও উত্তরণ ঘটানোর চেষ্টা করে গেছেন জাতির জনকের কন্যা, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

একেক জন রাজনীতিবিদের জীবনে ভোগ করতে হয়েছে কারাদহন। জেলের প্রকোষ্ঠে বসেও তারা ভেবেছেন কীভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। পরিবার থেকে বিছিন্ন হয়ে, বিলাসী জীবনের মোহ ত্যাগ করে তারা একের পর এক সংগ্রাম করে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম করেছেন। আমাদের জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এত উদার গণতন্ত্রী নেতা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার নেতৃত্বের সবগুণই পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। বাংলাদেশকে একজন রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, সেটা বিশ্ববাসীর কাছে এখন পরিষ্কার। যারা একসময় বাংলাদেশের নাম শুনলেই দুর্ভিক্ষপীড়িত, অসহায় দেশটিকে নিয়ে উপহাস করেছেন, তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছেন, তাদের দেশের মন্ত্রীরা এখন বাংলাদেশে এসে এ দেশের উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন এবং বিনিয়োগ করছেন। এ দেশের রাজনীতির গুণগত মান নিয়েও যারা নিয়মিত প্রশ্ন তুলতেন, তারাও চুপসে গেছেন। আর এই প্রশংসা কুড়িয়েছেন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাই। এ কথা যে কেউ নিঃসংকোচে স্বীকার করবেন।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে পরিবারের সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দেশের আকাশে কালো মেঘ জমতে থাকে। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান নিজেই ঘোষণা করে বলেছিলেন, `Money is no problem, I will make difficult politics for the Politians.’ অর্থাৎ ‘টাকা কোনো সমস্যা নয়, আমি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তুলব’।

তার এমন ঘোষণার ফলে রাজনীতিবিদরা বড় দুঃসময়ে পতিত হন। স্বাধীনতার ৪৫ বছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রমতায় প্রায় সাড়ে ২৮ বছর মতায় ছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তারা রাজনীতি করতে গিয়ে দেশকে পিছিয়ে নিয়েছেন বারবার। এই সময়কালে রাজনীতিতে হাইব্রিডদের আমদানি হয়েছে, যা পরবর্তী রাজনীতির গতিপথকে আর মসৃণ থাকতে দেয়নি। সিন্ডিকেট করে তারা রাজনীতিতে নোংরামি প্রবেশ করিয়েছে। স্বাধীনতার সপে মতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ যে বাকি সময়টায় অর্থাৎ সাড়ে ১৬ বছর মতায় আসীন ছিল এবং আছে তখন দেশে গণতন্ত্র ছিল, উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এর নেপথ্যে অবশ্যই রাজনীতিবিদরাই কাজ করেছেন এবং করছেন।

জিয়াউর রহমান মেধাবী ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন। ছাত্ররাজনীতিকে তিনি কলুষিত করে দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন। জাতি এসব ভুলে যায়নি। এরপর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা দল আমাদের প্রাণের সংগঠন আওয়ামী লীগেরই ’৯১ সালে মতায় আসার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছিল শুধু রাজনীতিবিদদের। আর বিএনপি ব্যবসায়ী, আমলা ও স্বল্পসংখ্যক আংশিক রাজনীতিবিদদের নিয়ে মাঠে নেমে মতায় আসে। কিন্তু ওই আমলে তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। বরং দেশকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে মতা থেকে সরে যাওয়ার সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও খাদ্যভাণ্ডার প্রায় শূন্য করে বিদায় নিয়েছিল। ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। রাজনীতিবিদরাই সেক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালে আবারও খমতায় বসে বিএনপি দেশকে পরপর পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করে। অর্থের দাপটে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে ওই আমলটিতেই। এরপর ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ভোট-বিপ্লবের মাধ্যমে মতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। বাংলাদেশকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এভাবেই রাজনীতিবিদরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তবে কষ্ট লাগে জাতির জন্য জীবনের তারুণ্য, যৌবনকে উৎসর্গ করা রাজনীতিবিদদের চরিত্র যখন হনন করা হয়। না জেনে, না বুঝে, বিষয়ের গভীরে প্রবেশ না করে তাদের প্রতি আক্রমণ করা হয়। পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। ৪০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনও করা হবে। সে ল্েযই কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ রাজনীতির এক উজ্জ্বল নত্র সৈয়দ আবুল হোসেনের চরিত্রে যে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছিল, তার সবই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত সব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন কানাডার আদালত। অথচ সামাজিকভাবে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনকে যে কষ্ট পেতে হয়েছে, তার জন্য দায়ী কারা? যারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর তুলে ত-বিত করেছিলেন তার চরিত্র ও হৃদয়কে; তারা কেন আজ মা চাইবেন না? এ প্রশ্ন আমাদের সবার। শুধু রাজনীতিবিদ বলেই আবুল হোসেনের চরিত্রের ওপর কেন কলঙ্ক লেপন করা হবে? সময় এসেছে যারা আবুল হোসেনের চরিত্র হনন করেছিলেন, তাদের মা চাওয়ার।

আমাদের সংসদীয় রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মারা যাওয়ার পর অনেকেই আফসোস করছেন। কিন্তু সেই কালো বিড়াল উপাধি দিয়ে তার হৃদয়ে কত রক্ত ঝরিয়েছিলেন, সেটা তার জীবদ্দশায় কেউ উপলব্ধি করতে চাননি। যে অপকর্মের সঙ্গে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিলেন না, সেটা নিয়ে তাকে যেভাবে অপমান-অপদস্ত করা হয়েছিল, তা ছিল সত্যিই লজ্জার ও বেদনার। এখন যারা তার জন্য আফসোস করছেন, তারাই বলছেন ওই কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন না সুরঞ্জিত। কালো বিড়ালের ঘটনাটি তার এপিএসই ঘটিয়েছিল।

সম্প্রতি নিজ বাড়িতে গুলিবদ্ধ হয়ে মারা গেছেন আরেক সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত গাইবান্ধায় মুক্তিযুদ্ধের সপরে শক্তি হিসেবে তিনি লড়াই করে গেছেন সারা জীবন। কিন্তু নিজের জীবন রার স্বার্থে গুলি করলে সেই গুলিটি গিয়ে আঘাত করে এক শিশুকে। শিশুটি মারা যায়নি, তার চিকিৎসার ব্যয়ভারও বহন করেছিলেন এমপি লিটন। কিন্তু ওই ঘটনায় মিডিয়া থেকে শুরু করে সবাই লিটনের চরিত্র হননই করেননি, পারলে শিরñেদও করতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। তবে লিটন নিহত হওয়ার পর তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে অনেকেই বলছেন, লিটন আসলেই একজন মানবিক গুণসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন।

পরিশেষে বলতে চাই, একজন রাজনীতিবিদের চরিত্রহননের আগে আমাদের আরও ভাবতে হবে। সব রাজনীতিবিদ যে ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’ সে কথা আমি বলছি না। অধিকাংশ রাজনীতিবিদই ভালো। খারাপের সংখ্যাটাই কম। তবুও না জেনে, না বুঝে রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন করা এবং তাদের মৃত্যুর পর অথবা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর আমাদের আহাজারি তাদের হৃদয়ে কি কোনো দাগ ফেলতে পারে? তবে যাদের হৃদয় ত-বিত হয় তারা আত্মতুষ্টি খুঁজে পান তখনই, যখন মানুষ দিনশেষে তাদের ভুলটা বুঝতে পারেন, তার পরও তারা মাফ চান না। মাফ না চাওয়টাও দুঃখের বিষয়। তাই আমরা চাই, খুব করে চাই; যেন রাজনীতিবিদদের চরিত্রহননের এই নিষ্ঠুর তামাশা বন্ধ হোক।

লেখক : এডভোকেট নূরজাহান বেগম মুক্তা, সংসদ সদস্য,  সংরক্ষিত নারী আসন

এসবিসি/এএস/এসবি