কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন

কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন

সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার থেকে : বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌছে মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়ে ইনানী পৌঁছেন। সেখানেই ২৮ কিলোমিটার পয়েন্টে ফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ উপলক্ষে সেনাবাহিনী আয়োজিত এক সুধি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের পাড় দিয়ে চলে যাওয়া এই ৮০কি.মি দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সড়ক পথটি ৪-লেন করার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিতে কক্সবাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সকাজার সড়কটিও ৪-লেন করার ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মেরিন ড্রাইভওয়ে ’৭৫ এর পর থেকে দীর্ঘদিন অবহেলিত কক্সবাজারের সৌন্দর্য অবলোকনে শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই করবে না বরং এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে একটি আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথাও তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্থ এই মেরিন ড্রাইভটি নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস আগেই নির্মাণ কাজ শেষ করে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারি সেনাবাহিনীর ১৬ ইসিবি’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল কে এম মেহেদী হাসান জানান, ‘মেরিন ড্রাইভ সড়কে ১৭ টি ব্রীজ, ১০৮ টি কালর্ভাট রয়েছে। নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি।’ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালযের সচিব এম এন সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল নিজাম উদ্দিন মোহাম্মদ, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল আবু এসরার উপস্থিত ছিলেন। সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এই সুধী সমাবেশে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কক্সবাজার এয়ারপোর্টে যাতে প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে অন্তত একটা ফ্লাইট আসতে পারে আপাতত সেই ব্যবস্থাটা আমরা করে দিচ্ছি। কক্সবাজার বিমানবন্দরটিকে একটি আধুনিক-উন্নত বিমানবন্দর হিসেবেই গড়ে তোলা হবে। সেই প্রকল্প ও আমরা শুরু করেছি। আপাতত একটি টার্মিনাল ভবন থেকে শুরু করে সবকিছুর কাজ আমরা শুরু করবো।
আর যে ৪ হাজার মানুষ এই এলাকায় থাকতো, তাদের জন্য আমরা আলাদাভাবে কর্ণফুলীর ওপারে ঘর-বাড়ি ও ফ্লাট তৈরি করে দিচ্ছি। এদের অধিকাংশই শুটকি তৈরি করেন, শুটকি বিক্রি করেন। তাদের জন্য সেখানে শুটকির হাটও করে দেয়া হবে। শুটকি মাছ শুকানোসহ তাদের বাসস্থানেরও জায়গা করে দেয়া হবে। ইতোমধ্যে সেই উন্নয়নের কাজও চলছে এবং নদীর ওপরে শিগগিরই ব্রীজ বানানো হবে। এখানকার মানুষগুলোকে সেখানে পুনর্বাসনের পাশাপাশি আমরা বিমানবন্দরের জন্য নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করবো এবং রানওয়েটাকেও আরো প্রশস্ত ও দীর্ঘ করা হবে। এটা যেহেতু আন্তর্জাতিক এয়ার রুটে পড়ে তাই ভবিষ্যতে যে কোন দেশ থেকে এখানে এসে যেন বিমান রিফ্যুয়েলিং করতে পারে তার ব্যবস্থাও করা হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের জন্য আমাদের সেনাবাহিনী অনেক কষ্ট করেছে। এখানে কাজ করতে গিয়েই পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে আমাদের সেনাবাহিনীর ৬ জন সদস্য জীবন দিয়েছেন।’ নিহত সেনাসদস্যদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন শেখ হাসিনা এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট লাগছে, আবার একদিকে আমরা আনন্দিত। আমার এতগুলো মানুষ এখানে জীবন দিয়েছেন, যারা এখানে ক্যাম্প করে ছিলেন। কিন্তু তারা সেখানে মাটিচাপা পড়ে জীবন দিয়ে যান। তাদের কথা সবসময়ই আমার মনে হয়। এত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই ১৬ ইসিবি এটাকে সুন্দর করে নির্মাণ করে দিয়েছে। সকলে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন বলেই এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব সময়ই একটা চিন্তা ছিলো যে, কীভাবে এই অঞ্চলের দরিদ্র মানুষগুলোর ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাব। আজকে যে মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন হলো সেই মেরিন ড্রাইভের মধ্যদিয়ে যেমন মানুষ সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবে সেই সাথে সাথে এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেরও বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ অঞ্চলের মানুষের সার্বিক উন্নয়নের একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাঁর জঙ্গিবাদ বিরোধী জিরো টলারেন্স নীতির পুনরোল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকবে, এখানে সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে বসবাস করবেন সেটাই আমরা চাই।’

এসবিসি/এসবি