ঘুরে এলাম মেক্সিকো

ঘুরে এলাম মেক্সিকো

মাহমুদুল খান আপেল : কনসাল্টিং কাজে প্রচুর ট্রাভেল করতে হয়। যদিও আমি ইন্টারনাল রিসোর্স, তারপরও আমাদের নিজস্ব প্লান্টগুলিতে প্রায় নিয়মিতই টুর করতে হয়।  সেগুলি তেমন প্লেজেন্ট টুর হয় না ব্যস্ততার কারণে। ইউএসএ থাকি, এখানে প্রচুর ট্যুর করেছি। তবে আমেরিকার বাইরে এই প্রথম, মেক্সিকো টুরে গেলাম। সাধারণত আমরা যাই সোমবার, ফিরে আসি শুক্রবার। এবার একটু দুরের টুর বলে গেলাম টানা দু সপ্তাহের জন্য, মাঝে একটা উইকএ্যান্ড ফ্রি। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে স্পেন থেকে আসা, আমার সাথে মেক্সিকান কলিগ। মেক্সিকান হলেও আমার কলিগ দেখতে ইউরোপিয়ান বা আমেরিকানদের মত! আবার তেমন স্মার্ট! লোকাল বলে ঐ ড্রাইভ করে, খুব এক্সপার্ট। তো সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম উইকএ্যান্ডে কোথাও বেড়াতে যাবো। শুক্রবার একটু আর্লি কাজ শেষ করে বের হলাম তিন ঘন্টার ড্রাইভে। এক নির্জন জায়গায় চমৎকার ট্রেডিশনাল হোটেলে অবস্থান করলাম! পরের দিন এক টুর গাইড তার নিজস্ব গাড়ি নিয়ে এসে আমাদের নিয়ে গেলো গহীন পাহাড়ে মধ্যে এক ঝর্ণা দেখাতে! টুর গাইড প্রথমে তাদের বাসায় নিয়ে বসালো, সেখানে একটু ফ্রেশ হয়ে চললাম কুনিং করে ( কেন্যু নৌকায় চড়ে) ঝর্ণা দেখতে! ঝর্ণা দিয়েই তৈরী হয়েছে মোটামুটি এক খরস্রোতা নদী! নৌকায় বসার আগে স্থানীয় দোকান থেকে সর্টস, আর পানিতে পরার জুতা কেনা হল। চেঞ্জ করে সবাই নৌকায় বসলাম! এরপর প্রায় ঘণ্টাখানেক স্রোতের বিপরীতে সবাই মিলে বৈঠা চালিয়ে পৌঁছলাম সেই ঝর্ণার কাছে!

ঝর্ণা দেখে ছবি তুলে ফেরার পথে আসল মজা! নদীর সবচেয়ে খরস্রোত যেখানটায়, সেখানে অনেকেই পানিতে নেমে পড়ে  এডভেঞ্চারের আশায়। আমরা যারা আগ্রহী ছিলাম, সেখানে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে নামিয়ে দেয়া হল। নৌকার মত নৌকা চলে গেলো আর আমরা ক’জন স্রোতে ভাসতে ভাসতে চলে এলাম এক মোহনায়। জাস্ট ভাবুন একবার! দুই পাশে পাহাড়, সাথে ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে গরু, হরিণ এসব দেখা যাচ্ছে। মাঝে খরস্রোতা নদী, সেখানে আমরা স্রোতে উল্টেপাল্টে ভেসে যাচ্ছি! কেমন হবার কথা ফিলিংসটা!  ভেসে এসে যে মোহনায় পৌঁছালাম, সেখানে আরেক বিস্ময় অপেক্ষা করছে। পাহাড়ের পাদদেশে এক গুহায় স্বচ্ছ পানি টলমল করছে, তার মধ্যে নেমে পড়লাম সবাই।

অন্তত এক দু’শ মানুষ সেই ছোট্ট গুহাটার ভিতরে! ইচ্ছেমত সাঁতার কাটা, ছবি তোলা শেষ হলে ফিরে এলাম নৌকায়! নৌকা বাকি পথ পাড়ি দিয়ে ঘাটে ভিড়ল। টুর গাইড গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন তাদের ছোট্ট বাড়িটিতে। বাড়িটি ছোট্ট হলেও টুরিস্টদের বসার জায়গাটা চমৎকার। ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলাম। একদম ঘরোয়া পরিবেশে মুরগির সালুন দিয়ে গরম গরম ভাত, সাথে ঠাণ্ডা পানির স্পেশাল সরবত। পেট পুরে খেয়ে সবাই যখন স্প্যানিশ ভাষায় গল্প করছে, আমি একাই বেড়িয়ে পড়লাম আশপাশের অলিগলি দেখার জন্য। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম পাহাড়ী অজপাড়া গাঁয়ের ঘরবাড়ি। একটা দোতলা বাড়ি চোখে পড়লো, সেটার উপরের তলার সবগুলি রুম না বানিয়ে বড় একটা খোলামেলা বারান্দা রেখেছে! মনে মনে ভাবলাম প্রকৃতির খোলা পরিবেশে এই বারান্দায় বসে যে স্বাদ পাওয়া যাবে, তা কি আদৌ কোন সুবিশাল বাংলোয় বসে পাওয়া সম্ভব!

কাজের মাঝেই বেড়ানো কিংবা বেড়ানোর মাঝে কাজ। উপভোগ করতে জানলে কাজে কখনোই ক্লান্তি আসে না। মেক্সিকো দেখলাম, কাজ সারলাম। তারপর ব্যাক টু দ্য প্যাভেলিয়ন। ফেরার পথ্র একটা হালকা টেনশন ছিল মনে। চারিদিকে শুনছিলাম, ইমিগ্রেশনে এখন নাকি অশান্তি হয়। নির্বাচনের পর থেকেই এসব কথা কানে আসছে। সত্যি বলতে কী, এসব কথা শোনার পর থেকে অনেকটা ভয়েই বর্ডার পার হইনি এতোদিন! এমনকি মাত্র ২৫ মিনিটের পথ বর্ডার পার কানাডা্য দাওয়াত খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছি! অফিসের কাজে মেক্সিকো যেতে হবে, নাও করতে পারলাম না।

গেলাম, ঘুরলাম, ফিরলাম। কিন্তু হাল্কা একটা টেনশন রয়েই গেলো! ফাইনালি ফেরার পালা, কী হয়! আসলেই সমস্যা হবে কি না? দূরু দূরু মনে ডেট্রয়েট এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে পৌছিলাম! মেশিনে সেল্ফ চেক করে একটা ওকে টিকিট দিলো, সাথে এত্তো বড় একটা ক্রস সাইন! দেখে তো চোখ ছানাবড়া! না জানি কত চেকিং এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়? টিকিটটা নিয়ে লাইনে দাঁড়াতেই এক একাউন্ট থেকে এক ইমিগ্রেশন অফিসার নেক্সট বলে ডাক দিলেন! গেলাম, শুধু বললো, “হাই”। সব পেপার দিলাম, শুধু বললো কতদিনের জন্য গিয়েছিলে? বললাম। এরপর বলে, ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট দাও।’  দিলাম। ছবি তুলে অফিসার জানতে চাইলো, কোন কিছু ডিক্লেয়ার করার আছে কি না। জানালাম, কিছু নেই।  এরপর “এ্যাডমিটেড” সিল দিয়ে, সব পেপার হাতে দিয়ে বললো, “ওকে দেন”! এটুকুই! গত চার বছরে ১৭/১৮ বার বর্ডার পার হয়েছি! এতো সহজ বর্ডার চেকিং খুব কম হয়েছে! যাক! খামোখাই দুশ্চিন্তা করেছিলাম। দুশ্চিন্তার মেঘ চট করে উড়ে গেল, আস্তানায় ফিরতে ফিরতে আমার মনটাও মেঘের মত উড়াল দিলো মেক্সিকোতে।

লেখক : বগুড়ার সন্তান। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে থাকেন, আইটি কনসালটেন্ট

এসবিসি/এমকেএ/এসবি