সত্য তুলে ধরুন

সত্য তুলে ধরুন

মাহমুদুল খান আপেল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে :  বেশ অবাকই হই আমাদের এই ছোট্ট দেশটার এক অভাবনীয় বৈশিষ্ট্যের কথা চিন্তা করে! সেই বৈশিষ্ট্যটা হলো আমাদের ধারণক্ষমতা! আমেরিকার কোন রিপোর্টার বা প্রশাসনিক ব্যক্তি বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেন বা লিখেন,  তখন কী জানান তারা? তারা  এভাবে পরিচয় করিয়ে দেন যে, ৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই দেশটির আয়তন বড জোর ওহাইও স্টেটের সমান, কিন্তু জনসংখ্যা পুরা আমেরিকার ডবল! এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে খেয়েপরে বসবাস করে প্রায় একশত আশি মিলিয়ন মানুষ! টোকিও বা সাংহাই’র মত  অল্পকিছু মেগা সিটির অধিবাসী ছাড়া কাউকে বোঝানোই সম্ভব হয় না যে, কী পরিমাণ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ আমাদের! কেউ বিদেশ না এলে, নিজ চোখে অন্যদেশ না দেখলে হয়তো কম্পেয়ার করতে পারবেন না। বুঝতেও পারবেন না যে, এই ব্যাপার টা আসলে কেমন! ইউরোপ-আমেরিকার কথা বাদই দিলাম, মাত্র ঘুরে এলাম মেক্সিকো থেকে। আমেরিকার পাশের দেশ এবং চিপ লেবারের কারণে  আমেরিকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইনভেস্টমেন্ট এই দেশটাতে। কাজেই তাদের ইকোনমি বেশ স্ট্রং এবং দেশের ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রায় আমেরিকার সমতূল্য বলা চলে! কিন্তু মানুষ নেই!

মেক্সিকান কলিগ থাকার কারণে কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। হাইওয়ে ধরে যখন যাওয়া হয়, তখন মাইলকে মাইল নির্জন ভূমি পড়ে আছে। কোন জনবসতি নেই, আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রই! যেখানে আমরা অবস্থান করলাম, একটা থ্রি স্টার বা ফোর স্টার মানের হোটেলে সেখানে। ঐ হোটেল, কটা মুদি দোকান, আর অল্প কিছু বাড়ি-ঘর। সব মিলিয়ে তিন থেকে চারশ’ মানুষ হবে! এই একই পরিমাণ জায়গায় আমাদের দেশে হলে অন্তত চার পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস হতো।

বিকেলে সুযোগ পেয়ে একাই অলিগলি ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। ছোট্ট ছোট্ট বাড়ি-ঘর, প্রায় বাড়িতেই নিরাপত্তার জন্য কুকুর পোষা হয়। ফসলি জমিন খুব কম! আসলে সবই হয়ত ফসলি জমি কিন্তু দরকার হয় না বলে কেউ ব্যবহার করে না। অধিবাসীদের আর্থিক সচ্ছলতা যেমনি হোক,, ভাঙ্গাচোরা হলেও একটা করে গাড়ি আছে প্রায় সবার। একদমই যারা গরীব, তাদের জন্য সাইকেল, মোটরসাইকেল বা পাবলিক বাস। একরকে একর জমি অব্যবহৃত পরে আছে! অথচ আমাদের দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমি ব্যবহার হচ্ছে প্রতি মিনিট। ছয় ইঞ্চি জায়গা এদিক ওদিক হলে প্রায় খুনাখুনির পর্যায়ে যায়! আর ইউরোপ আমেরিকায় বাড়ি কিনলে প্রতিবেশী এসে শুধু আন্দাজ করে দেখিয়ে দিয়ে যায় যে এটা তোমার সীমানা। এই পর্যন্ত জায়গার ঘাস কাটার দায়িত্ব তোমার! কেউ চাইলে নিজের সীমা ঘিরে রাখে নিজের প্রাইভেসির জন্য, এটুকুই।

যা বলছিলাম, আমাদের দেশের এই ঘনবসতি আমার কাছে মনে হয় সৃষ্টিকর্তার একটি ইঙ্গিতবাহী নিদর্শন। দেশের তেমন কোন রিসোর্স নেই, তারপরও এতোগুলি মানুষের প্রতিদিন কম বেশী রিজিক জোটান উপরওয়ালা! তার উপর যুক্ত হলো কয়েক লক্ষ ভাগ্যবিড়ম্বিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি! একটা দেশের উন্নয়ন বলতে যা বোঝায়, সেটা হলো সে দেশের মূল ইনফ্রাস্ট্রাকচার। যেমন, রাস্তা-ঘাট সাথে ব্রিজ কালভার্ট, উন্নতমানের এয়ারপোর্ট, এসবের উপর ভিত্তি করে সামঞ্জস্যপূর্ন পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন! সেদিক থেকে আমরা উন্নয়ন শুরুই করতে পারিনি! এবং যে অবস্থা তাতে নিকট ভবিষ্যতে শুরুর কোন সম্ভাবনাও দেখি না! আমাদের এই মুহূর্তে যা আছে তা হলো, ‘ল্যাপ ছ্যাপ’ দিয়ে কোন ভাবে চালিয়ে নেয়া! যারা এইসব ছোটখাটো স্ট্রাকচার নিয়ে গর্ববোধ করে, আত্মতৃপ্তিতে ভোগে, তারা হয় উন্নয়ন কী জানেই না। না হলে, যারা জানে তারা বেশারভাগ ধান্দাবাজ, তারা দেশবাসীকে জানতে দিতে চায়না, আসল উন্নয়ন কী? জানলে তাদের ধান্দাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে, সেই ভয়ে! বিশ্বাস করেন, আসলেই তাই। কিছু মানুষ দেশে উৎপাদিত দেশী কলার মধ্যেও ব্যাপক সম্ভাবনা দেখে এবং সেটা দিয়ে মানুষ কে ভুলিয়ে রাখে।

অনেকটা এভাবে, এই ধরেন একটা কলার মধ্যে তো বীজ থাকে। সে বীজ থেকে নতুন গাছ জন্মাবে, সেখানে আবার অসংখ কলা জন্মানো যাবে। সেই সব প্রতিটি কলার মধ্যে থাকবে অনেক বীজ। সেগুলি থেকে আবার কি পরিমান কলা জন্মানো সম্ভব, একবার ভাবুন! অল্প ক’দিনেই দেশটাকে কলাময় করে তোলা সম্ভব! এটা দেখে দেশের মানুষ ভাবে আমাদের দেশে এতো সম্ভাবনা, আমরা কখনও চিন্তাই করিনি! এমন ‘ভণ্ডামি’ মার্কা লেখায় দেখবেন মিনিটে হাজার লাইক। কারণ, সে সম্ভাবনার কথা বলেছে! আর আপনি সত্যটা তুলে ধরবেন, সবাই ভ্রু কুঁচকে, দু চার জন রাগের ইমো দিয়ে পোস্ট রিপোর্ট করে চলে যাবে! দেশ নিয়ে এসব তুলনা লিখতে লেগে অনেক কিছু লিখতে হয়! তবে সম্ভাবনা যে নেই, তা কিন্তু না! বরং যে ঘনবসতিপূর্ণ জনগোষ্ঠির কথা বললাম, সেগুলি আসলে এক একটি সম্ভাবনার এটম বোমা! উদাহরণ: চায়না! কিছুই নেই। আছে চিপ লেবার, এবং একটি স্টেবল প্রশাসন। যে কারণে আমেরিকার মত দেশ, যারা তাদেরকে চির শত্রু মনে করে, তারাও কিন্তু ইনভেস্টটা ওখানে গিয়েই করে! এ কারণে তারা এগিয়ে গেছে তরতর করে। আমাদের লেবার আছে, নেই শুধু একটি স্টেবল প্রশাসন। নেই বলা ভুল হবে, আসলে স্টেবল হতে দেয়া হয় না। কারণ আশপাশের শক্তিগুলি ভালো করেই জানে যে একটু খানি স্টেবিলিটি পেলে এদেশটা কেমন করে উঠে যাবে! তাই তারা কৌশলে অভ্যন্তরীণ ‘ক্যাঅস’ বাধিয়ে রাখে সব সময়। এই সুযোগ তারা পায় একটা কারণে। আমাদের একটা জিনিষের বড্ড অভাব, তা হলো দেশপ্রেম! দেশটা রসাতলে যাচ্ছে, সেটা ভাবে না। আমার স্বার্থ ঠিক আছে তো, তাতেই চলবে! এটা একটা ভয়ঙ্কর কমতি। দেশ প্রেমটা সঠিক ভাবে সবার মাঝে থাকলে বিদেশী শক্তি বার বার আমাদেরকে নিয়ন্ত্রনের সুযোগ পেতো না। জানি না এটাকে কিভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব! আপনি যদি দেশটাকে সত্যিই ভালোবাসেন তবে সত্য তুলে ধরুন। মানুষকে সত্যিকারের দেশপ্রেম কী, সেটা শেখান। দেখবেন, দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি এমনিতেই কমে যাবে।

ধরুন, কোন কোন কেমিস্ট ভেজাল ঔষধ বাজারে ছাড়ার ফরমূলা দেয়। কিন্তু তার ভেতর যদি দেশপ্রেম থাকে, মানুষের প্রতি, পরিবারের অন্যদের প্রতি ভালোবাসা থাকে; তবে সে এই কাজ করার আগে ভাববে। এই ভেজালযুক্ত ঔষধ খেয়ে যদি আমার দেশের মানুষ, আমার কোন প্রতিবেশী বা কোন আপনজন মারা যায়, কেমন লাগবে আমার? এ সচেতনতাটা যদি আমরা জাগিয়ে তুলতে পারি, দেখবেন এসব অনিয়ম, দুর্নীতি আপনা থেকেই কমে গেছে! আর এটাই হলো সত্যিকারের চেতনা!

তবে সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের এব্যাপারে অনেক কিছু শেখার আছে! এদের দেখে শিখুন, একটি স্বাধীন ভূখণ্ড কতটা মূল্যবান। মাথার উপর একটুখানি চালা, যা রোদ-বৃষ্টি থেকে আপনাকে রক্ষা করবে; সেটা কতটা মূল্যমানের! আপনি যখন দেখবেন, একদল মানুষ যাদের মাথার উপর এক টুকরো ছাদ নেই, বৃষ্টির মধ্যে ছোট বাচ্চা নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে! কতটা অসহায়! অথচ এরাও আমাদের মত মানুষ! এই জায়গাটায় নিজেকে কল্পনা করুন, ভাবুন আপনি কতটা লাকি! এখানেই আমাদের উপলব্ধির জায়গাটা! সেদিন মাত্র ৯ ঘণ্টার ট্রানজিটের জন্য মেক্সিকো সিটি এয়ারপোর্টের একটা লাক্সারী হোটেলে চেক ইন করলাম। ডিনারসহ সেই ৯ ঘণ্টার জন্য ২ শ’ ডলার গুনতে হলো। তাও আমাদের কোম্পানির স্পেশাল ডিসকাউন্ট আছে বলে একটু সস্তা! সকালে চেক আউট করার সময় বিলটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। আর ভাবলাম, এই দু’শ ডলারে হয় প্রায় ১৬ হাজার টাকা, এটা দিয়ে কতগুলি রোহিঙ্গা পরিবারকে এক বেলা খাওয়ানো সম্ভব ছিলো! কতটা পরিবারের মাথা গোঁজার সাময়িক শেল্টার বানানো যেতো! এই ভাবনাটাই হয়ত চেতনা! তবে সেটা ভণ্ডামির নয়, সত্যিকারের।

লেখক : বগুড়ার সন্তান। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে থাকেন, আইটি কনসালটেন্ট

এসবিসি/এমকেএ/এসবি