মানিককে চাই না

মানিককে চাই না

সালেহ্ বিপ্লব/আহমেদ শাহেদ : নিজ জেলা বলে কথা, খবরতো রাখতেই হয়। কিছু খবর রাখতে হয় না, হাজির হয়। বজায় থাকে। যেমন চাঁদপুর শহরের রাস্তাঘাটের অবস্থা। শহরে গেলে দেখা শুধু না, টেরও পাওয়া যায়। বাসস্ট্যান্ড থেকে আবদুল করিম পাটওয়ারী সড়কে বেশিদূর এগুতে হবে না। মসজিদের সামনে থেকে বিপনীবাগ যদি রিকশা বা অটো বাইকে যান, বাথরুমের বেগ নিয়ে না উঠাই ভালো। হেঁটে গেলে সাথে একজোড়া রাবার বা প্লাস্টিকের জুতো রাখলে ভালো হয়। পুরো শহরের একই হাল। এসব খবর ঠেকে ঠেকে পড়ি, আজ অনেক মাস ধরে পড়ছেন চাঁদপুরের মানুষ। চাঁদপুর দেশের ঐতিহ্যবাহী পৌরসভা, পৌরবাসী অনেক বিড়ম্বনায় আছেন। রাস্তার যন্ত্রণা, বিদ্যুতের সাম্প্রতিক টানাপড়েন, নামীদামী পরিবারে মাদক ব্যবসা এবং আরো অনেক রকম অত্যাচারে আছে রূপসী চাঁদপুরের মানুষ। এই জনতার মধ্যে যারা আওয়ামী লীগের বিপক্ষে, তাদের জীবনে যন্ত্রণা আরো বেশি। বরাবরই এন্টি আওয়ামী লীগ ফোর্স গুরু মানে বিএনপিকে। সেই বিএনপি চাঁদপুর জেলায় নিজের কোদাল দিয়ে নিজের ‘পশ্চাৎদেশ’ কাটছে! কী করে কী হবে, এই ভাবনায় অস্থির দলের মাঠকর্মী ও সমর্থকরা। জেল-জুলুম-হুলিয়া যাদের মনোবল ভাংতে পারেনি, সেই নেতাকর্মীরা এখন হতাশার হাতছানি দেখতে পাচ্ছেন। চাঁদপুর বিএনপি’র আহ্বায়ক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকে অপসারণ করা হোক, এই দাবিতে জেলা উপজেলায় রাস্তায় নেমেছে দলের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ। রাস্তায় আগুন জ্বলে, জুতা মিছিল হয়। ঝাড়ুও হাতে নিয়েছেন তারা। নেতৃত্বে শফিকুর রহমান ভূঁইয়া। জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। চাঁদপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন একবার।

মানিকের বিরুদ্ধে শফিক! বিষয়টি অবাক করার মতো। শফিক ভূঁইয়া বিএনপির তৃণমূল থেকে উঠে আসা এক পরীক্ষিত নেতা। জাগদল থেকে দলের সাথে আছেন। সারাজেলায় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের সাথে তার নিবিড় সম্পর্ক। ইলেকশন মেকানিজম খুব ভালো বোঝেন। অন্যদিকে, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বিএনপির চরম দুর্দিনে চাঁদপুর জেলায় দলের হাল ধরেছেন। এই নেতাকে সরিয়ে দিতে হবে, কী এমন প্রেক্ষাপট! এতে করে বিএনপি’র অর্জন কী হবে, তাও বোঝার একটা চেষ্টা আমরা করছি কয়েক মাস ধরে।

জেলা কমিটি গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে, সেও বছর গড়াতে চললো। তার আগে থেকেই শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের বাসভবন ও লাগোয়া জেলা অফিসকে কেন্দ্র করে বিএনপি সক্রিয় হতে থাকে। ওয়ান ইলেভেনের ধাক্কা শেষ হতে না হতেই মামলা-হামলা বিএনপির নিত্যসঙ্গী হয়েছে। মানিক সাহেব তখন জেলার সাধারণ সম্পাদক, নিজেও কম বিপদের মুখে পড়েননি তিনি। ঝড়ঝাপটা সামলানোর নিজস্ব মেকানিজম আছে তার, অনেক কষ্ট হলেও একটা সময় তিনি সব কিছু সামাল দিয়ে মাঠে ফিরে এসেছেন। ইউনিয়ন থেকে নির্বাচিত কমিটি গঠনের নির্দেশ কেন্দ্রের, শেখ মানিক সেভাবেই কাজ শুরু করেন। বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন শুরু হয়। আর তখনই স্পষ্ট হতে থাকে, দুর্দিনে দলের হাল ধরতে গিয়ে একটি প্রতিপক্ষ তৈরি করে ফেলছেন তিনি। দলের জেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত মানিকবিরোধী পক্ষ তৈরি হয়েছে। সংখ্যায় বিরোধীরা কম নয়, নেতৃত্ব দিচ্ছেন শফিক ভূঁইয়া।

দল পুনগর্ঠনের শুরু থেকে এসবিসি৭১ বিভিন্ন জেলার মতো চাঁদপুর জেলা বিএনপির খোঁজখবর রেখেছে। জেলার আহ্বায়ক কমিটি হওয়ার পর থেকে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের কাছে খবরাখবর জেনেছে। জেলায় গ্রুপিং স্পষ্ট হওয়ার পর বেশ কিছুদিন আগে জেলা কমিটি গঠনের জন্যে বৈঠক ডাকা হয় ঢাকায়। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মীর নাছিরউদ্দিন নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় অফিসে জেলার ২১ নেতাকে নিয়ে বসেন। চট্টগ্রাম বিভাগের সিনিয়র নেতারা ছিলেন। সেখানে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানান জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা। বাদপ্রতিবাদ হামলার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, দলের তরুণ নেতারা আশপাশে থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। সভা ভ-ুল। শফিক ভূঁইয়া তার সমর্থকদের নিয়ে লাঞ্চ করতে যান বিজয়নগরের একটি রেস্টুরেন্টে। আর শেখ মানিক লাঞ্চ করতে যান হোটেল ৭১-এ, সাথে ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। সেখানে নিরাপত্তার শংকা দেখা দেয়, নয়াপল্টন থেকে ছাত্রদলের কয়েক জন নেতাকর্মী এসে হোটেল ৭১ থেকে অতিথিদের নিরাপদে বের করে নিয়ে যান।

‘সেদিন আপনারা মানিক সাহেবের ওপর আরেক দফা হামলার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন?’ প্রশ্ন রাখলাম শফিক ভূঁইয়ার কাছে। কথা হচ্ছিলো চাঁদপুর বড় স্টেশন এলাকায় তার বরফ কলে বসে। ১ থেকে ২২ তারিখ মাছ ধরা বন্ধ, এই সময়টা বরফ কলের মেইনটেন্যান্স টাইম। তিনি হামলা বিষয়ক অভিযোগ সাফ অস্বীকার করলেন। বললেন, ‘আমরা ভাত খেয়ে বের হয়েছি, কেউ একজন দেখালো; হোটেল ৭১-এর সামনে মানিক সাহেবের গাড়ি। সবাই সেদিকে একটু তাকিয়েছে, তাতেই মানিক সাহেবের বাহিনী ভেবেছে; আক্রমণ হবে।’

‘এই বিষয়টি বোঝা গেলো। এখন বোঝা দরকার, আপনি মানিক সাহেবকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে কেন নেমেছেন?’

‘আমি আন্দোলনে নামিনি। দলের জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত সাধারণ নেতাকর্মীদের আকাক্সক্ষকে ধারণ করছি। চাঁদপুর জেলা বিএনপি আজ কুক্ষিগত হয়ে গেছে। মানিক সাহেব প্রতিটি উপজেলায় নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করতে গিয়ে দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বঞ্চিত করেছেন। পদপদবী না দেয়া তো একটি দিক, সবচেয়ে জঘন্য হচ্ছে; পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। এতে করে তার কী লাভ হচ্ছে, তিনি জানেন। আমরা দেখছি, তিলে তিলে গড়ে তোলা দলটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এক ব্যক্তির আধিপত্য বিস্তারের লোভের কারণে। ম্যাডাম স্পষ্ট করে বলেছেন, সর্বশেষ নির্বাচনের এমপিদের সাথে রেখে দল গোছাতে বলেছেন, কিস্তু মানিক সাহেব তার বিপরীত করছেন।

সাবেক পৌর চেয়ারম্যান বললেন, ‘এই জেলায় ভোটের লড়াইয়ে বিএনপির সব সময় ভালো অবস্থানে। ফরিদগঞ্জে আমরা সর্বশেষ ৩২ হাজার ভোটে লিড করেছে। হাজীগঞ্জে আমরা ৫ থেকে ১০ হাজার ভোটে লিড করি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে চাঁদপুরে বিএনপিকে হারানো যায় না। এই বিপুল জনসমর্থনকে যারা সংগঠিত করেন, সেই ওয়ার্কিং ফোর্সটাকে মানিক সাহেব ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছেন। এটা মেনে নেয়া সম্ভব না। আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, টাকাই রাজনীতির মূল যোগ্যতা নয়। আজ বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে টাকা ও পেশীর মাস্তানি নির্মূল করতে হবে।’

বিএনপির এই নেতার অভিযোগ, ‘ঢাকার কোন কোন নেতা কোন কোন কারণে মানিক সাহেবকে ফেভার করেন। কেন্দ্রীয় অফিসে যেদিন বিক্ষোভের কারণে সভা স্থগিত হলো, তারপর আরেকদিন সভায় তারিখ দেয়া হয়েছিলো। সেই সভায় চাঁদপুরের প্রতিনিধি তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেয়া হয়। এসব বিষয় জেনে আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মীর নাছির ক্ষুব্ধ হন, সে সভা আর হয়নি। এখন জেলায় আসবেন নেতারা, জেলাতেই ফয়সালা হবে। আমরা তার আগে মানিকের অপসারণ চাই। হিংসা ও রাহুমুক্ত বিএনপি চাই।’

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুরের এসব ঘটনায় মীর নাছির খুব রেগেছেন। সরাসরি অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে। কারো পক্ষ নয়, বরং চাঁদপুর বিএনপির সাম্প্রতিক অবস্থার পরিস্কার চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। গুলশান অফিস সূত্রে যতোদূর জানা গেছে, মীর নাছির ক্ষোভ দলীয় প্রধানকেও স্পর্শ করেছে। তিনি বিরক্ত হলেও তার বিশ্বস্ত এই সহকর্মীকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, তিনি নিজেই চাঁদপুরের বিষয়টি মনিটর করবেন। লন্ডন সফর শেষে দেশে ফিরেই বেগম জিয়া বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নগর ও জেলা কমিটির অনুমোদন দেবেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের দেশে ফেরার তারিখ জানা যায়নি এখনো, তবে প্রেস উইং-এর শাইরুল কবীর খান জানিয়েছেন, ১৫ অক্টোবরে পর ফিরবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও ৬০ জেলার কমিটি প্রস্তুত। বেগম জিয়া ফিরলেই ঘোষণা করা হবে। বিএনপির বেশ ক’টি জেলা কমিটিও অনুমোদনের অপেক্ষায়, আর চাঁদপুরের সুপার ফাইভ ঘোষণা হবে সেসব জেলার সাথেই।

এই প্রেক্ষাপটে বিক্ষোভের আগুন চাঁদপুরের সংগঠনে, প্রতিবাদীদের নেতা শফিক ভূঁইয়ার পরামর্শ, ‘ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের দিয়ে মাঠে জরিপ করানো হোক। ভিন্ন জেলার নেতাদের নিয়ে এমন টিম পাঠানো হলে কেন্দ্রের কাছে চাঁদপুরের প্রকৃত চিত্র ক্লিয়ার হয়ে যাবে। অন্যান্য জেলাতেও এটি করা যায়।’

কমিটি ঘোষণার টার্গেট সময় ফুরিয়ে আসছে, এখনো চাঁদপুর জেলার আহ্বায়ক মানিককে অপসারণ দাবিতে চাঁদপুর জেলা বিএনপি’র একটি অংশ অনড়। মানিক সাহেব থাকবেন, এই দাবিতে অপর অংশ অটল। মানিক-শফিক ‘কাইজ্জা’ কীভাবে নিচ্ছেন বিএনপির সমর্থক ও ভোটাররা? খুব একটা ভালোভাবে অবশ্যই না।

প্রবীণ এক সমর্থক, মিছিলে না গেলেও জনসভায় যান। ‘শোনেন বাবা। প্রেসিডেন্ট জিয়া খাল কাটতে এসেছিলেন, সেই ৭৮ সালে। হাজীগঞ্জ গিয়েছিলাম তাকে দেখতে। দেখেছি, সালাম বিনিময় হয়েছে। সেইদিন থেকে তাকে অন্তর থেকে ভালোবাসি। আজও নীরবে তার দলের সাথে আছি। ধানের শীষে ভোট দেই। নিজের পরিম-লে বিএনপির ভোট তৈরি করেছি। এই বিএনপি আমাদের। মানিক বা শফিকের কাছে বিএনপি ইজারা দেই নাই। যা করার একসাথে করেন। একসাথে বসেন। চা খান। দেখেন কোন সমাধান হয় কি না? আমরা কাউকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করার পক্ষপাতী না। যার যা অবদান, তাকে ততটুকু স্বীকৃতি দিতেই হবে।’

ছাত্রদলের এক সাবেক নেতা, দু’পক্ষের পাটাপুতায় কাহিল। তার ভাষ্য, ‘মানিক ভাইকে বলবো, রাস্তাঘাটে ঝাড়–-জুতা থামানোর ব্যবস্থা করেন। আহ্বায়ক আপনি, দায়িত্ব আপনার বেশি। আর শফিক চেয়ারম্যানকে বলবো, আগুন যা জ্বালানোর তো জ্বালিয়েছেন। আমরা যদ্দুর জানি, ম্যাডাম খালেদা জিয়া চাঁদপুরের কোন্দলে বিরক্ত। নয়াপল্টনে হাঙ্গামা হওয়ার পর তিনি নিজেই বিষয়টি দেখবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সুতরাং রাস্তায় আগুন না জ্বালিয়ে চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তের জন্যে অপেক্ষা করুন।’

সরেজমিন যে হাল দেখা হলো, আমাদেরও মনে হয়েছে; শীর্ষনেতার হস্তক্ষেপই চাঁদপুর বিএনপিতে শান্তি আনতে পারে। স্বস্তির সেই দিনটির জন্যে অপেক্ষা করছেন বিএনপির কর্মীসমর্থকরা।

এসবিসি/এএস/এসবি