ওস্তাদের গুরু

ওস্তাদের গুরু

সালেহ বিপ্লব ঃ এই ছবিটা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মহামান্য রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদের সাথে সাংবাদিক কুদ্দুস আফ্রাদ। দৈনিক পূর্বকোণের ঢাকা অফিসের প্রধান কুদ্দুস ভাই। সেই সাথে আনন্দবাজার পত্রিকার বাংলাদেশ অফিসের স্টাফ রিপোর্টার। এক সময়কার ছাত্রলীগ নেতা, তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির জেলার মানুষ। হামিদ ভাই তার রাজনৈতিক গুরু। আর আমার রাজনীতি ও সাংবাদিকতার গুরু কুদ্দুস ভাই। গুরুর সুবাদেই আমার সুযোগ হয়েছিল তার গুরুকে খুব কাছ থেকে দেখার। এই ছবিটা আমাকে সেই কাহিনী মনে করিয়ে দেয়।

২০০২ সাল। পূর্বকোণ ছেড়ে আবার ফিরলাম ঢাকায়। খোলাকাগজ নতুন আঙ্গিকে বের হবে, টুকু ভাই অফিস নিলেন নয়াপল্টন। আদিত্য শাহীন বার্তা সম্পাদক, চিফ রিপোর্টার শাহনেওয়াজ দুলাল। টিমে আছেন আরেফিন ফয়সল, মঞ্জুরুল বারী নয়ন, ফাহমিদা শীলা। চিফ ক্যামেরাম্যান রাকীব ভাই। কিছুদিন আগে মারা গেছেন, অসম্ভব রকম গুণী এবং প্রফেশনাল ছিলেন। দুষ্টু এবং মজার মানুষ ছিলেন, মামা বলে ডাকতাম। খোলাকাগজে আমাকেও নেয়া হবে, দুলাল ভাই কাজের সুবাদে আমাকে চিনতেন। আসা যাওয়া শুরু করলাম। সন্ধ্যার পর যাই কুদ্দুস ভাই’র কাছে। পূর্বকোণ ঢাকা অফিস। নোয়াখালী হোটেলের চায়ের টানে কি না, অনেক সাংবাদিক আসতেন পূর্বকোণে। কুদ্দুস ভাই একদিন বললেন, ‘বসেই তো আছো। ট্যুর করে আসো। বলতে পারো শিক্ষা সফর। হামিদ ভাইর সাথে সিরাজগঞ্জ ঘুরে আসো।‘ হামিদ ভাই মানে এডভোকেট আব্দুল হামিদ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। কুদ্দুস ভাই স্কুলজীবন থেকে ছাত্রলীগ করেন। পেশায় এসে একটা সময় সরাসরি দলীয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন। সক্রিয় হন সাংবাদিক সংগঠনে। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, নির্বাচিত হয়েছিলেন ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটিতে। এখন জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটিতে আছেন। দলীয় পদে না গেলেও রাজনৈতিক যোগাযোগ সবসময় ধরে রেখেছেন। রাজনীতি ও সরকার বিটের রিপোর্টার হওয়ার কারণেই এটা তার জন্য সহজ হয়েছে। আওয়ামী লীগ ৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আমি জানতে পারি সে সময়কার ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট আবদুল হামিদ খুব স্নেহ করেন আমাদের চিফ রিপোর্টার কুদ্দুস ভাইকে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হামিদ সাহেব হলেন  জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা। আর আমি তখনই একমাত্র রিপোর্টার হিসেবে তার সফরসঙ্গী হচ্ছি! উত্তেজনা চেপে রাখা কঠিন। তিনি আগের সংসদের স্পিকার। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি গণ মানুষের নেতা। যার শরীরে মাটির সোঁদা গন্ধ, অন্তরে মানুষের জন্য মমতা। জাতীয় সংসদে বেশ কয়েক বছর ধরে কাজ করি, সেই সুবাদে সামান্য আলাপ পরিচয় আছে। এমন একজন নেতার সাথে সফরে যাওয়া মানে বিশাল একটা লাভজনক ব্যাপার। পরিচয় শক্ত হবে, এতো বিশাল পাওয়া! আসা যাওয়ার সময় কথা তো কিছু হবে, দেখা হবে অনেক কিছু। সুতরাং মুভ। একটা কাজ বাকি, লোকাল কন্টাক্ট লাগবে। খোলা কাগজের চিফ রিপোর্টার শাহনেওয়াজ দুলাল ভাই’র বাড়ি সিরাজগঞ্জ। তিনি ফেরদৌস রবিনের নাম্বার দিলেন। কথা বলিয়ে দিলেন। জানলাম তিনি আমাদের মামা। সকালে চলে গেলাম এমপি হোস্টেলে। গিজগিজ করছে জেলার নেতাকর্মীতে, এমন রাজনৈতিক জমায়েত থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। দরাজ সম্ভাষণ, আন্তরিক করমর্দন, অতঃপর চায়ের কাপ। সফরে যাবেন, গাড়িতে ওঠার আগ পর্যন্ত কথা বলবেন মানুষের সাথে। এর মাঝেই বেশ কয়েক মিনিট আমাকে সময় দিলেন, কথা বললেন। এক ফাঁকে এপিএস এসে গাড়ির খবর দিলেন। গাড়ি রেডি। এতক্ষণ কথা হচ্ছিল সিরাজগঞ্জ সফর নিয়ে। যুবলীগের এক নেতাকে খুন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে পরিবারের সাথে দেখা করবেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। এপিএস আসার পর প্রসঙ্গ চেঞ্জ হল। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়েই বললেন, ‘দেহেন আমার গাড়ির অবস্থা! হঠাৎ কইরা স্টার্ট বন্ধ। ডেপুটি লিডার অব দ্য অপজিশন হিসেবে একটা ভালো গাড়ি পাওয়ার রাইট তো আমার আছে, নাকি?’ আসলেই সাদা কারটা ওই পদের সঙ্গে মানানসই ছিল না। বরং ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। গাড়ি ঠিক করে আনা হয়েছে। তার পরেও সফরসঙ্গীদের বললেন, ‘তোমরার গাড়িত আমার লাইগা একটা সিট রাইখো।‘ তিনি যে খুব মজার মানুষ, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তো শুরু হল আমাদের যাত্রা, সেই প্রথম আমি যমুনা সেতু  পাড়ি দিলাম। সুন্দর শহর সিরাজগঞ্জ। ছিমছাম। ফেরদৌস রবিনের সাথে দেখা হল স্পটে। তিনি এত বড় মাপের মানুষ, আগে ঠাহর করতে পারিনি। উদীচীর জেলা সম্পাদক ছিলেন, নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার ছিলেন। খুব ভালো মানুষ। আমরা এসাইনমেন্ট কাভার করে গেলাম সার্কিট হাউজে। এ ধরণের প্রোগ্রামে হয় কী, নেতা স্মার্ট না হলে সফরসঙ্গীরা অনেক সময় ভাত পান না। হামিদ ভাইর ক্ষেত্রে সেটা হওয়ার জো নেই। টেবিলে বসতে বসতেই চোখে মেপে নিলেন। কার কার থাকা উচিত, তাদের কে নেই? আমার দিকে চোখ পড়তেই বললেন, আগে খাইয়া নেন। এনার্জি নিয়া লিখতে বসবেন। খাবার আসতে আসতে আরও টুকটাক কথা। আমি তো খাবারের আইটেম দেখে ভড়কে গেলাম। হালাল সব মাংস আছে, চেনাজানা মাছ অনেক পদের। একটা মাছ চিনি না। হামিদ ভাই এই মাছটা দেখেই বেশ খুশি হলেন। আমার পাতে আরেকটা মাছ তুলে দিলেন। জানালেন, এটা বাছা মাছ। যমুনার স্পেশাল উপহার। তাই একপিস বেশি খেতে হবে। খাওয়াদাওয়ার শেষ, দই এলো। এবার আবারো আমার পাতে নেতার নজর। ‘এইটা ঢাকায় পাইবেন না। এইটা বেশি খাইলে ক্ষতি নাই।‘ কী বলব আমি! এত বড় মাপের নেতারা মানুষ হিসেবেও এত বড় হন! কুদ্দুস আফ্রাদ ভাইকে মনে মনে আবার ধন্যবাদ জানালাম। আসলে এমন একজন চিফ রিপোর্টারের হাতে তৈরি হতে পারা অনেক সৌভাগ্যের। নিজ হাতে সিঁড়ি তৈরি করে দেন, পথ চিনিয়ে দেন! তো এই সফরে আমরা কী শিখলাম? আমরা দেখলাম, কী কী গুণের বলে একজন রাজনৈতিক নেতার উত্তরণ ঘটে জননেতার কাতারে। শুধু সংবিধান আর কার্যপ্রণালী বিধি জানলেই তাদের চলে না। রসুন বোনার মৌসুম কখন শুরু কিংবা আমন ধানের সেরা জাত কোনটি তাও জানতে হয়। জানতে হয়, হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে গেলে বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নেয়ার আগেই ভেষজ কী চিকিৎসা দিতে হবে। তেজস্বী যেমন, তেমনি কোমল। যেমন দুঃসাহসী, তেমনই কৌশলী। সব যোগ্যতার ভিত্তিমূল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ। এমন এক মহান নেতাকে কিছুটা হলেও জানতে পারার সুযোগ করে দেয়ায় কুদ্দুস ভাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিয়েও শেষ করতে পারব না। শেষ করব এভাবে, হামিদ ভাইর মত নেতা হতে হলে হৃদয়ে মানুষের মানচিত্র আঁকা থাকতে হয়।

কৃতজ্ঞতা ঃ নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ থেকে পুনঃপ্রকাশ 

এসবিসি/এসবি