যাপিত জীবনের দিনলিপি

যাপিত জীবনের দিনলিপি

জাকারিয়া চৌধুরী : মেঝো ভাই, বাবা এমনকি মা-ও আমাকে সহ্য করতে চাইছিল না। আমি দেখেছি, নষ্ট সন্তানদের সবচে বড় প্রশ্রয়দাতা হয় তাদের পিতা। চরম নীতিবাক্য আওড়ানো লোকেরাই তার ধর্ষক ছেলেকে পালিয়ে যাওয়ার গোপন পথ চিনিয়ে দেয়। এ কাজটা তারা করে দম যাবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত। একটা বিষয় জানার সাধ আমার আছে। মানুষ মারা যাবার আগে সত্যি কি খোদার নাম নেয়, নাকি দুনিয়াদারি জমিজমা, পুত্র কন্যার চিন্তাতেই বিভোর থাকে ? মা বাবা কেন যে তাদের নষ্ট সন্তানদের সবচে বড় প্রশ্রয়দাতা হয় কে জানে? প্রায় প্রতিটি পরিবারেই দুই একটা জানোয়ার জন্মে। তাদের সব অন্যায় অনাচার পিতামাতার কানে যেন ওহী নাজিল হবার মত আনন্দময়। আমি যেহেতু প্রতিক্রিয়াশীল এবং এর ফলভোগ করতে হয় মারাত্মকভাবে সেহেতু শিশুবেলা থেকেই জেনে এসেছি- সংসারে কখনো সুবিচার পাওয়া যায় না। আমি নিজেকে গুটিয়ে রাখি। বর্ষার শামুকেরা যেভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে আমিও যেন তেমন। দিনে দিনে শামুক হয়ে গেছি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ওদের এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম । দুপুরে ভাত খাবার পর পরই বড় ভাইয়ের সাথে শামীমের এয়ার গান নিয়ে বেরিয়ে পরি । সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখির পেছনে ছুটি । মজার ব্যাপার হল, আমরা কেউই কোন পাখি মারতে পারিনি এক জীবনে। সন্ধার পর প্রতিদিনই কিছু না কিছু বাজার সদাই করি । এতে দুটো ঘটনা ঘটল। ভাল ঘটনা হল আমি লিকার খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিলাম। আর খারাপ ঘটনা বলা যায়, আমার পড়াশোনা গোল্লায় গেল। তবে মনের জোর ফিরে পেতে শুরু করলাম । আমি তাহলে একা নই, কেউ একজন আছেন ছায়া হয়ে। একই সাথে ঘরে পরিবর্তন শুরু হল। আপা তার প্রাইমারি স্কুলের চাকরি ছেড়ে বিসিএস-এ জয়েন করে চুনারুঘাট চলে গেল অবিবাহিত থেকেই । এই বঙ্গনারীর বয়স তখন ৩১ পার হয়ে গেছে । আমার আইএসসি পরীক্ষার বাকি ৬ মাসেরও কম । আব্বা সহকারী অধ্যাপক হিসেবে এল পি আর-এ চলে এসেছেন । এই অবস্থায় তাঁর কর্মকাণ্ড সীমা ছাড়িয়ে গেল। সারাদিন নানান জাতের আলতু ফালতু লোক নিয়ে থাকেন । হোমিও রিসার্চ সেন্টার খুলেছেন কিছু ষণ্ডা-পাণ্ডা নিয়ে। এরা দুপুরে গোসল করে, দল বেঁধে নামাজ পড়তে যায়, এসে সবাই গোল হয়ে বসে ভাত খায় এবং তারপর দিবানিদ্রায় যায়। ঘুম ভাংগার পর আবার শুরু হয় মিনিটে মিনিটে চায়ের ফরমায়েস, সিগারেটের ফরমায়েস। ফরমায়েসের যেন শেষ নেই। সেই সময় আকাশ পাতাল এক করে বাসায় একটা টিএন্ডটি কানেকশন নিয়েছিলাম। এই টেলিফোন এখন হয়েছে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। ষণ্ডার দল সারাদিন ফোন নিয়ে পরে থাকে। ঢাকা চিটাগাং, নাটোর, রাজশাহী থেকে শুরু করে এমন কোন জেলা নেই যেখানে এরা খুঁজে খুঁজে পরিচিত লোক বের করে ফোন করে না। বড় ভাই বেতন পায় ৬২০০, টেলিফোন বিল আসে ৩৫০০। ঘরে যে একটা অরাজকতা আসবে এমন আশংকা আমার হচ্ছিল। উঠানে আমার লাগানো দুই তিনটা পেয়ারা গাছে ১ম বারের মত হাজার হাজার পেয়ারা এসেছিল । পিঁপড়া তাড়ানোর নামে বাবা সবগুলো গাছের গোড়ায়  কেরোসিন তেল ঢেলে দিলেন । পেয়ারাসমেত গাছগুলো মরে গেল । অথচ প্রতিদিন আমি এগুলোয় এরোসল দিতাম, গোড়ার মাটি আলগা করে দিতাম, মানে যা কিছু করনীয় তার সবই করতাম । মনে খুব কষ্ট পেলেও কিছু বলার নেই । একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি আব্বা আম্মা বাসায় নেই । গেল কই ? কাউকে কিছু না জানিয়ে কোন এক মহিলা কবিরাজের কাছে আম্মাকে নিয়ে গেছে একুশ দিনের জন্য । খুব টেনশন হতে থাকলো আম্মার জন্য । যেখানে পিজি হসপিটালের ডাক্তাররা আম্মার কিছু করতে পারেনা সেখানে…!

২২ তম দিনে এক পা এবং কোমর ভেঙ্গে আম্মাকে ফেরত আনা হলো চিরপঙ্গু করে। আগে যাও কিছুটা হাঁটতে পারতেন এখন তাও শেষ হয়ে গেল । নিরব দর্শকের মত দেখে গেলাম । সারা রাত পশুর মত ঘো ঘো করে আম্মা চিৎকার করে কাঁদে। ছোট বেলা থেকেই আম্মা চিৎকার করলে আমি ঘুমাতে পারি না। দৌড়ে গিয়ে লাইট জ্বালাই। সব শান্ত । লাইট নিভালে আবার শুরু। এভাবে আমাদের রাত কাটে। এই প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামেচিতে আমি ( সবাই ত আর বাসায় ছিল না সব সময় ) পার করেছি জীবনের কুড়ি বছর। শেষ রাতের দিকে শুরু হত আব্বার মারপিট। কী ভয়ঙ্কর ভাবে মোটা বাঁশ দিয়ে আম্মাকে পেটাত যে, কেউ না দেখলে তা বিশ্বাস করা অসম্ভব। এ্যাবসলিউটলি অসম্ভব। আমি প্রতিদিন আম্মার মৃত্যু কামনা করতে থাকলাম। কপালে মৃত্যু না থাকলে তাকে যাতনা সইতে হবে- এটাই হয়ত বিধির বিধান। এ জাতীয় অমানবিকতায়, একসময় সবাই মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে পড়ল কিন্তু আমি পারলাম না । আম্মা জেগে থাকে শারীরিক কষ্টে আর আমি জেগে থাকতে শুরু করলাম ভয়ে। এমন অমানুষিক নির্যাতন আম্মা কমপক্ষে আরও ১৫ বছর সহ্য করে অবশেষে মৃত্যুবরণ করলেন আমার কোলে মাথা রেখে । এটা আমার চোখে এক প্রকার হত্যাকাণ্ড। আম্মা মারা গেলেন গলায় শুকনো চিঁড়া আটকে। এমন একজন রোগীর মুখে শুকনো চিঁড়া দিল কে ? এত ভাবনার সময় ছিল না। মৃত্যুর একেবারে আগ মুহুর্তে আম্মাকে উলটো করে ঝুলিয়ে বুকে গলায় থাপ্পর মেরে তার শ্বাস নালী খুলে দেই। পুরো দৃশ্যটা আব্বা জানালা দিয়ে দেখলেন। আম্মা মারা যাওয়ার সাথে সাথেই তিনি সবাইকে বলে বেড়ালেন, তিনি নিজে দেখেছেন আমি আম্মাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পিঠে থাপ্পড় মারছি, ঝাঁকাচ্ছি। হ্যাঁ, আমি সেসবই করছিলাম। এর প্রয়োজন ছিল। আম্মা যখনই নিঃশ্বাস নিলেন, আমি তাকে আমার কোলে শুইয়ে দিলাম। আমার চোখের পানি পড়ছে তার চোখে, তার চোখের পানি গড়িয়ে বিছানা ভিজিয়ে দিচ্ছে। তিনি স্পষ্ট উচ্চারনে আমার সাথে কথা বলতে বলতেই মারা গেলেন। বহু বছর পর আমার মনে প্রশ্ন এসেছিল, আম্মা মারা যাবার আগ মুহুর্তে বাবা কোথায় ছিলেন ? তিনি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেন কেন ? ভেতরে আসলেন না কেন ? আম্মাকে এতো এতো খারাপ নির্যাতনের কারণ শুরুতে আমি জানতাম না । সে আসলে ২য় বিয়ে করতে চাইছিল । এই আধামরা মহিলার সারা গায়ে কালো কালো দাগ জমাট বেঁধে থাকতো । নির্যাতনের চিহ্ন । একদিন শীতের দুপুরে আম্মা আমাকে ডেকে বললেন, আজ সন্ধায় ঘরে নতুন বউ আসবে । তোর সৎ মা । কোন রকম ঝুট ঝামেলা বাঁধাবি না কিন্তু । আমরা পাঁচ ভাই বোন, একটা চাচাত বোন ( সে আমাদের সংসার মেনটেইন করত ) , দুইটা কাজের লোক থাকতে বিয়ের প্রয়োজনটা কী? আম্মা

বললেন, শুধু আমার সেবার জন্য তাকে আনা হচ্ছে । বড় আপা বললেন, এইটা আব্বার ফান্ডামেন্টাল নিড । সেঝো ভাই বললেন, আব্বা অবশ্যই বিয়ে করবে । ( সেঝ ভাই, সে-ই এই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠবে এক সময় ) বলল, আব্বার সমস্যাটা আমাদের সবারই বোঝা উচিত । দেখা গেল আমি আর বড় ভাইয়া ছাড়া সবাই মোটামুটি বিষয়টা সম্পর্কে জানে । সন্ধ্যায় সবাইকে অবাক করে দিয়ে মোটা, কালো, ডিভোর্সি এক নোংরা চেহারার এক মহিলাকে সাথে নিয়ে বাবা সাব উপস্থিত। সাথে যথারীতি ১৫-২০ জনের এক দঙ্গল বন্ধু বান্ধব,যেন এদের সামনে আমি কিছু বলতে না পারি। এই মহিলা বাঁজা, সেটাও জানা গেল। একজন রিটায়ার্ড প্রফেসর ত্রিশ হাজার টাকা যৌতুক নিয়ে বিয়ে করেছেন। আমার ইচ্ছে হল, মাটি ফুঁড়ে আমি গভীরে আরও গভীরে কোথাও চিরতরে হারিয়ে যাই।

রাত দশটা পর্যন্ত রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে কাটালাম । বড় ভাইয়া এসেই জানতে চাইল আমাদের এই মুহূর্তে করণীয় কী? বললাম, আমি তুমি এই বিয়ের স্বীকৃতি দেব না কিন্তু বাস্তবতা মেনে কাউকে কিছু বলবও না । ভাইয়া এই কথা মেনে নিলেন। আব্বা এলপিআর-এ চলে যাবার পর খেয়াল করলাম, বড় ভাইয়া আমার সাথে শোয় কিন্তু ঘুমায় না। সারা রাত প্রায় জেগে থাকে। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করি কিন্তু কোন উত্তর নেই। আপার বিসিএস হবার আগে বা পরে তারও সরকারী চাকরি হয়ে গেল। আমি ভাবছিলাম, এই বুঝি ভাইয়া চলে গেল। তার পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশন, বিয়ে কত কী বাকি! আমি বললাম, ভাইয়া তুমি ঢাকা চলে যাও পড়াশোনা করতে। তুমি যা স্যালারি পাও তা দিয়ে তোমার বেশ চলে যাবে। আমাদের কচু-ঘেচুর জীবন না হয় আর ক’টা বছর চলুক। বিশ্বাস করো, মাছ মাংসে আমার ভীষণ ভয়। আমি অভ্যস্ত না। তুমি চলে যাও, এভাবে হতাশায় ভোগার কোন মানে হয় না। আমরা এতটা বছর খেয়ে না খেয়ে কাটিয়েছি। এখনো পারব। তুমি বরং চলেই যাও। এক গভীর রাতে সে অদ্ভুত অসম্ভব এক স্বপ্নের কথা শোনাল। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।

(১৮ ই অক্টোবর ২০১৩ রাত ২ টা ২৫ মিনিট)

এসবিসি/জেডসি/এসবি