আঁধার জীবনের ভাঁজে ভাঁজে 

আঁধার জীবনের ভাঁজে ভাঁজে 

জাকারিয়া চৌধুরী :  চুনারুঘাট সরকারী কলেজে থাকা অবস্থাতেই আপার বিয়ে হয়ে গেল । আপা যেমন কৃপণ তেমনই কৃপণ সদাহাস্য এবং নো ম্যাটার টাইপ তার স্বামী। আপা ভীতু সাবধানী, তার জামাই আরও ভীতু আরও সাবধানী। আপা ছোট সাইজের মানুষ, সেও একটু বেঁটে ছোটখাটো লোক। শিয়াল কালারের একটা প্যান্ট পরে সে প্রথম আমাদের বাসায় বেড়াতে আসলো। তার জুতাও শিয়াল কালারের। অতিরিক্ত হলুদে ঠাসা কিন্তু জুতার সামনের অংশ কন্ডমের মত খয়েরি কালারের। সে পারলে চব্বিশ ঘন্টা-ই জুতা মোজা,প্যান্ট এর মধ্যে শার্ট ঢুকিয়ে ফিটফাট থাকার চেষ্টা করে আর দরদর করে ঘামতে থাকে। বাজারে যাবার সময়ও এই লোক তার বিখ্যাত নাকচোখা সু পরে ঘর থেকে বের হয়। সবার সব কথায় সমর্থন দেয়। বড় ভাইজান নিজেকে শালা হিসেবে মেনে নিতে চাইল না। তাই দুলাভাই তাকে আপনি সম্বোধন করতে লাগল। আমাদের স্বচ্ছলতা উপচে পড়ছে। ভাইয়া এক বিকেলে বাবুকে ( আমার ইমিডিয়েট বড় ) সাথে নিয়ে বাজার থেকে বিশাল এক পাংগাস মাছ কিনে নিয়ে এলেন। ৮০০ টাকা দামের মাছ হয়, এ তথ্যই আমার জানা নেই। জীবনে প্রথমবারের মত পাংগাস মাছ খেলাম। সে কি সুস্বাদু মাছ! আমার যেন গলা দিয়ে নামছিল না! এত সুখ, এত সুখ, এত সুখ সইবে তো? পাংগাসের এক পিস মানে হচ্ছে আগে পুরো তরকারিতে মেশানো প্রোটিনের সমান। এত প্রোটিন এত ফ্যাট কি এই কুকুরের পেটে সইবে, নাকি কখনো সয়েছিল? হায় সুখপাখি  !!!

সুখের কথাই যখন উঠল, বিয়ের বারোতম বার্ষিকীতে বউকে বললাম, ‘সখী, তুমি কি হাতে চিঠি লিখতে পারো?’

– তুমি কি চাও তোমাকে এই বুড়ো বয়সে চিঠি লিখি ?

বউ কিভাবে যেন মনের কথাটা ধরে ফেলল। লজ্জায় মরে যাবার দশা আমার!

‘এক জনমের সাধনায় কোন নারী যে সম্মান আর ভালোবাসা পেতে পারে সে আমি পেয়ে গেছি এক যুগেরও কম সময়ে। এত ভালোবাসা রাখি কোথায়। ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।’

এই চিঠিটাই বউ আমাদের এক যুগপুর্তি উপলক্ষ্যে লিখেছিল। তার ঠিক সাড়ে তিনমাস পরে সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল ঘূর্ণাক্ষরেও কিছু বুঝতে না দিয়ে। সে আমাকে প্রতিদিন বলে, সে আর আমাদের একমাত্র সন্তান খুব ভাল আছে। আমি সাথে থাকলে এত মানসিক চাপ সে কিছুতেই নিতে পারত না। ও ভাল কথা, সে যথেষ্ট সৎ জীবন যাপন করে। তার কথা শুনে আনন্দে চোখে আমার পানি এসে যায়। ওরা ভাল আছে, ওরা ভাল আছে। আমার ছেলেটা কথা বলতে পারে না, তবু ওরা ভাল আছে। কোন দাগা-ই সন্তান হারানো কিংবা সন্তান তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে, তার’চে বড় নয়। আমি সন্তানের কষ্ট খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি। কথা বলতে না পারার কষ্ট।

পুরনো কথায় ফিরি। দু:খিত ভাই বেরাদর্স। আমি মিনিটে মিনিটে নস্টালজিক হয়ে যাই। বড় আপার বিয়ের আগে জামাই বা সেই পরিবারের সাথে আগে কখনো আমাদের দেখা হয়নি কিন্তু বিয়ের এক ঘণ্টা পর আপা দুলাভাইকে দেখে দেখে বোঝার উপায় রইল না যে তারা পরস্পরের অপরিচিত। কেমন সুন্দর করে আপা তার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন, হাসাহাসি, মাতামাতিতে মজে গেলেন। বিয়ের পরদিন দু’জনে কোটবাড়ি থেকে গোপনে ঘুরেও এলেন। আমার কাছে মনে হয়েছিল,তারা দুজনেই আসলে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। তারা যে কোন ভাবেই হোক না কেন, সঙ্গী খুঁজে পেতে মরিয়া ছিলেন। তারা ছিলেন ক্লান্ত কিন্তু সন্তান জন্মদানে উদগ্রীব । দুলাভাইকে আমার আহামরি কিছু মনে হল না। সর্বদা খুঁতখুঁতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন একজন লোক যার হাতে বা ওয়ালেটে জীবনে কখনো কোন ময়লা টাকা দেখিনি। বিবাহিত স্বচ্ছল ছেলেদের উচিত নয়, স্ত্রীর সাথে নিজের মা’কে রাখা। এতে পারস্পরিক কলহ বাড়ে। মাতৃসেবা আসমানে উঠে। অন্যদিকে বউয়ের সাথে তার মা থাকলে কী হয়, সেটা রামের সুমতি ছবিতে আশা করি একশ ভাগের এক ভাগ হলেও দেখেছেন। মা-মেয়ে দুয়েই নষ্টা হয়ে যায়। ( আপার গল্প এখানেই সমাপ্ত। যিনি আমাকে মাতৃস্নেহ দিয়েছেন, এই গল্পে চিরঅসুস্থ ভাল মানুষ এই বোনটিকে শ্রদ্ধা দেখালাম, না কি অসম্মান করলাম, না নির্মোহ থাকার চেষ্টায় সাধনা করে গেলাম, জানি না। ইফতারের এই পাঁচ-সাত মিনিট আগে চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। আমাদের ভালোবাসাগুলো সব নষ্ট হয়ে গেলো। )

বড় ভাইয়া চাকরির ভাইভা দিয়ে এসেছিলেন অনেকদিন হয়ে গেল । হঠাৎ করেই তাঁর চাকরি হয়ে গেল তাও সরকারি চাকুরি ( আগের পর্বেই উল্লেখ করেছি ) । আমি ভীত হয়ে পড়লাম এবং খুশি হবার ভান করলাম। ভাইয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেলে কোনদিন-ই এ বাসায় আর আগের মত ফেরত আসতে পারবেন না বুঝি। ইনি চলে গেলে ঘরের সবাই আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করবে জানি। আমি এও জানি আমি নিশ্চিতই নির্দোষ। কোনমতে বললাম, তোমার পোস্টিং কুমিল্লা করানো যাবে না ? লাকসামে পোস্টিং হল। এই যাত্রায় টেনশন ফ্রি হলাম । অন্তত খাওয়া-পরার ভয় আর করতে হবে না, নির্যাতন কেউ করবে না। ভাইয়া সপ্তাহে তিনদিন অফিস করেন, বাকি তিনদিন ফয়সল হসপিটালে সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করেন । ১২৫০০ টাকা থেকে একলাফে ঘরের আয় বেড়ে দাঁড়াল ২৫০০০ টাকায় । অজস্র টাকা । একটা ড্রয়ারে এই টাকা থাকে । এর একটা চাবি আমার কাছে অন্য চাবিটা থাকে ভাইয়ার কাছে । ওনার কাছে চাবি থাকা না থাকা সমান কথা। ঘরের সব খরচ করি আমি। আজ ইফতার খেতে খেতে আমার নতুন করে মনে পড়ল, এই ড্রয়ারের একটা কয়েনও আমি অবিবেচনায় খরচ করিনি, কাউকে ঠকাইনি, সকলের প্রতি সমান মর্যাদা নিশ্চিত করেছি। ঘরে নতুন টেলিফোন সংযোগ এসেছে । আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা থেকে পাঁচ হাজার টাকায় মার্বেল পাথরের একটা সুন্দর টেলিফোন সেট কিনে নিয়ে এসেছি । ঘরের সদাইপাতি থেকে শুরু করে সব কিছুই চলে আমার ইশারায় । দরকার লাগলে ভাইয়া ফোনে ইন্সট্রাকশন দেয় । যদিও তার প্রয়োজন সাধারণত হয় না। আমার কথায় ঘর চলবে কেন ? এ নিয়ে বিবাদ গনগনে লাল হচ্ছিল যখন তখন-ই ভাইয়া বললেন তিনি ফয়সল হসপিটালে ইস্তফা দিয়েছেন। অতিরিক্ত আয়ের আশায় তিনি অন্য একটা বাজে হসপিটালে জয়েন করেছেন। আমি যেন কিছুটা লজ্জাই পেলাম। নিজেকে নির্লজ্জ আর লোভী মতে হতে থাকলো। কিন্তু এখানে আমার ভূমিকা কী ? ভাইয়া টাকা কামাইয়ের জন্যে ক্রেজি হয়ে উঠছেন বুঝতে পারছি কিন্তু সে অংকটা কত ? একটা পরিবারের গড় আয় কোথায় গিয়ে ঠেকলে মানুষ বলে, আর আয়ের দরকার নাই ? নাকি তার চাহিদার কোন শেষ নেই ?

বড় ভাইয়া আমার উপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দেবার অন্য যে কারণটি ছিল, তা হল সবার ছোট হয়েও আপার পুরো বিয়েটা একহাতে শেষ করেছিলাম কোনোরকম দাগ ছোপ ছাড়া । শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জোরে একটা শব্দ পর্যন্ত হয়নি বলতে গেলে । এই বিয়েতে প্রায় দুই লক্ষের অধিক টাকা খরচ হয়ে যায় যার একটি টাকাও বাবা বা অন্য কেউ শেয়ার করেননি। ধারকর্জ আর ঘরে জমানো টাকায় আমরা দু’জন এসবের বিলি বন্দোবস্ত করি।

ভাইয়া কিছুটা ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে কিন্তু তাঁর মনোবল থেকে যায় আকাশচুম্বি । এতদিনে আমাদের বাসার মাসিক খরচ আরও বেড়ে ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে স্থিতিশীল একটা অবস্থায় এসে ঠেকেছে । সমস্যা যেটা ক্রনিক তা হল ২৪ ঘণ্টাই আত্মীয় স্বজনদের চিৎকার চেঁচামেচি হইহুল্লোড় চলতে থাকলো । সারাদিন কেটলিতে চা জাল দেয়া হচ্ছে । যার যখন ইচ্ছা ফরমায়েস দিচ্ছে, খাচ্ছে । কোন নিয়ম শৃঙ্খলা আর রইল না । সবাই গোষ্ঠী নিয়ে বেড়াতে আসে আম্মাকে দেখার ছলে । যাবার সময় ব্যাগভর্তি করে কাপড়চোপড়, টাকাপয়সা চুরি করে চলে যায় । এমন কি চুরির ব্যাগ আগেভাগে পাঠিয়ে দিতেও দ্বিধা করে না । গ্রাম থেকে আসা বেশিরভাগ আত্মীয়স্বজনই চুরি চামারিতে পাকা হয়ে গেছে। এদের নীচতা আমাকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলল তবে তার অর্থ এই নয় যে, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আমি মানুষকে সম্ভবত আরেকটু স্ট্যান্ডার্ড লেভেলে প্রত্যাশা করতাম। যখন কচুঘেঁচু খেতাম তখনো আমার ভাবনার জগত যথেষ্টই স্ট্যান্ডার্ড ছিল। এরা এমন কেন?

আমার সৎ মা দিনভর তামাক খায় শুনে আমি কিছুটা বিহবল হয়ে পড়লাম। এ কী শুরু হল ঘরে? ইকুয়েল এন্ড অপজিট ডিম্যারিটস?  দিনে পঞ্চাশ টাকার তামাক ফুকা চাট্টিখানি কথা নয় । সপ্তাহে তার দুইদিন সিঙ্গাপুরে কথা বলতে হয় । নয় বোনের মধ্যে অন্তত তিন জনকে এনে নিজের কাছে রেখেছে । এই বিষয়ে আব্বার কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হল না । সেও দিব্বি ফ্লোরে শুয়ে শুয়ে তামাক শেয়ার আর সেবনে ব্যাস্ত । নিজের কোরামের লোকদের সাথে সারাদিনই মস্করা ঠাট্টা করে বেড়ায় । যে লোক কুড়ি টাকা দিত না পরীক্ষার ফি সে-ই আজ রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে বেসামাল! ভাইয়া কষ্ট করে যে টাকা আয় করে, সে টাকাকে বাবা নিজের কিছু মনে করে না। কাউকে বেহিসেবি হতে বারণ করে না, ঘরে যেন একটা লংকাকাণ্ড শুরু হল। আমার মনে হল, বাবা বিশ্বাস করে, অচিরেই একদিন সকালে ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ সহ ভাইয়া চলে যাবে। সুতরাং, সাঙ্গপাঙ্গসহ এইসব লোপাটে সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । আমি ভাবছিলাম, যেদিন ভাইয়া সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে সেদিন তারা টের পাবে ।

আমি এমন শত শত উদাহরণ দিতে পারব যে ভাইয়ার দিলদরিয়া মার্কা আচরণকে আব্বা নানা ভাবে উৎসাহ দিত। ‘তুমি শুধু চাকুরিজীবীই নও । তুমি নিজে একটা হসপিটাল পরিচালনা করো, সো তুমি একজন ব্যবসায়ীও । আর ব্যবসায়ীদের হাত থাকে খোলা । তারা নিত্যদিনের খরচে বিচলিত হয় না । বিচলিত হলে তাদের চলে না । তোমার হয়তো বুদ্ধি বেশি কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বেশি।’ – এ জাতীয় কথা বলে তাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহ যোগানো হত। ভাইয়া খরচের হাত যেন তিনগুন বাড়িয়ে দিলেন। যখন মাসে পাঁচশ টাকা পরিবার পিছে টিএন্ডটি বিল আসে, তখন এই পরিবারের মাসিক বিল গিয়ে ঠেকল সাত হাজারে। একজন সরকারী চাকুরের মাসিক বেতন তখনো ৬৫০০ ক্রস করেনি। আমার খুব খারাপ লাগতো এবং আমি এইসবের মোটিভ বুঝতে পারতাম । যার বোঝার দরকার সে না বুঝলে তো আমি নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে দিতে পারি না। তাই না ? তাছাড়া আমি মদ টদ খাই সামান্য হলেও। কিছুটা কোণঠাসা জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পরেছিলাম ।

আপনজনেরা লুটপাট শুরু করে দিয়েছে। না বলেও বিষয়টা আমার প্রাণপ্রিয় ভাইয়ের নজরে আনলাম । কিন্তু ততদিনে তাঁর পিঠে সওয়ার হয়ে গেছে নতুন ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের ভুত । তিনি বর্তমান হসপিটালও ছেড়ে দেবেন। তিনি আমাকে তার স্বপ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন। আমার বমি করে দেবার দশা হল। এসবের কোনই প্রয়োজন নেই। এদিকে ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। আমি যেভাবে পাশ করেছি সে রেজাল্টের উপর ভর করে যে উচ্চতর গণিত করা যাবে, সেটুকু বুঝ ততক্ষণে হয়েছে। মনটা আরও ছোট হয়ে গেল। আমি চোখেমুখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম।

২০ অক্টোবর রাত ৩ টা ১০ মিনিট ২০১৩ ইং

এসবিসি/জেডসি/এসবি