দ্য ওয়র্স্ট ড্রিম অন আর্থ

দ্য ওয়র্স্ট ড্রিম অন আর্থ

জাকারিয়া চৌধুরী : এক রাতে ভাইয়া সত্যি সত্যিই আমাকে জাগিয়ে তুললেন। তার চেহারা ভয় পাওয়ার মত যথেষ্ট উত্তেজিত, বিরক্ত এবং তাকে ভীতু কাকলাশের মত দিকভ্রান্ত মনে হচ্ছিল। তাকে সিরিয়াসলি নিয়েই উঠে বসেছিলাম কারণ তার চেহারায় এমন অস্থিরতা ছিল যা দেখে আমি নিশ্চিত হই, হি সারটেইনলি ডিসাইডেড সামথিং…. আই হ্যাভ টু নো হ্যয়াট হি থিংকস…. তার সাথে আমার সামান্য কথাবার্তা হল।
: আমরা একটা হসপিটাল করব। অন্যের হসপিটালে ডিউটি দিতে আর ভাল লাগছে না। ধর নিজেদের একটা হসপিটাল থাকলে……

-মানে কি? আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের হসপিটাল করার দরকার কি? সে-ই বা হঠাৎ করে এত সিরিয়াস হয়ে উঠল কেন?

: নিজেদের হসপিটাল না থাকলে এই শহরে মান সম্মান নিয়ে.. …………

ক্রিসেন্ট হসপিটালের মালিক হাজি মিজান এই কয়দিন আগেও ছিল চিটার মিজান……

ফয়সল হসপিটালের মালিক নাসির ভাই মুদি দোকানদার থেকে……….. আজ এই হালে আসছে। চিন্তা কর, মাত্র পাচ বছরে……… তার চোখ চকচক করছে। জীবনে প্রথম সন্দেহ হল – ডু আই রিয়েলি নো হিম ? সে টাকা টাকা করছে কেন ? আপা চলে গেছে। এখন আপাতত আমাদের টাকার দরকার নেই।

-ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ মাচ পেনি ডু উই নিড টু স্পেন্ড ফর……? আমি জিগেস করলাম।

: আব্বার পি এফ, পেনশন আর যা সেভিংস আছে তা দিয়ে অন্তত শুরু করে দেয়া যাবে। এর পরেও যদি আটকে যাই তাইলে উত্তর পাত্রের ৪৮ শতক জমিটা বেচে দিব। কি কস? তার সাবলিল উত্তর। আব্বা যে পেনশনে এসেছে, সেখান থেকে বিভিন্ন খাতে টাকা আসবে এসব আমার ঘুনাক্ষরেও মনে ছিল না। থাকলেই বা কি ? তার সারা জীবনের সঞ্চয় তার। যার সাথে কথাও বলতে রুচিতে বাঁধে তার টাকা আছে কি নেই সে ভাবনা ভাবতেও রুচিতেই বাঁধে। তবু সাহস করে বললাম;

-যে লোক বিশ টাকা পরীক্ষার ফি দেয়না সে তোমাকে তার জীবনের সকল সঞ্চয় দিয়ে দেবে? আমরা তিনভাই এখনো পড়াশোনা করছি। তুমি বরং তোমার বন্ধু টিপুর মত ঢাকায় চলে যাও, সেটল্ড হও এবং পোষ্ট গ্র‍্যাজুয়েশন কর। তুমি যা আয় করো তা দিয়ে নিজে ভালই চলতে পারবে। ( আগেও বলেছি )

: অই, তুই কি হসপিটাল করার পক্ষে নাকি বিপক্ষে স্পষ্ট করে বল। আমি সারা মাসে বেতন পাই ৬২০০ টাকা। তুই যখন কোথাও পড়তে যাবি এই টাকায় তোর পড়াশোনার খরচই উঠবে না। তাছাড়া আমি বিয়ে করব। এই জংলায় থেকে বিয়ে করা যাবে না, পুরো বাড়ি রিকন্সট্রাকশন করতে হবে।

– বাড়ি ভাড়া ১১০০-১২০০ টাকায় উত্তীর্ন হয়েছে। একে সামান্য ঝাড়পোছ করলেও পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে। মালিক এত টাকা খরচ করবে? তাছাড়া এখনই বিয়ের পাগল হয়েছ কেন? তোমার বয়স কত? বিয়ার পাগল হইলা কেন ? আমার মনে শত প্রশ্ন।

: বাসার কাজ আমরাই করব, পরে ভাড়া থেকে কেটে নেব- তিনি মুখস্ত উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। সব আগে থেকেই ঠিক করা।

ভাইয়া যেন ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিলেন। এ বিষয়ে যে কোন আলোচনায় আমি ক্ষেমা দিলাম। সে সারাদিন নানান ধরনের ধান্ধাবাজ টাইপ লোক নিয়ে বসে থাকে। হসপিটাল ছাড়া তার মুখে কোন কথা নেই। নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তা বাদ দিয়ে দুনিয়ার দালালদের সাথে সক্ষতা গড়ে তুলেছে লোকটা। পেঁপে, কাঁঠাল, আনারস এই সেই প্রতিদিনই কেউ না কেউ দিয়ে যাচ্ছে। আমি বিব্রত, লজ্জিত হই। ঠিক হলো বাসার সবার সাথে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

যে বদ অভ্যাস শিশুকাল থেকেই আমাকে ভুগিয়েছে তা হল বার্ষিক পরীক্ষার আগে ১৫-২০ দিন বিরামহীন পড়ে পাশ করা। সব বিষয়ে সাদামাটা ভাবে পাশ করে যেতে পারলেই আমি খুশি। ক্লাসে কয়েক ধরনের ছাত্র থাকে। একদল থাকে যারা ছাত্রত্বের গুনে প্রভাবশালী, আরেকটা বিশ্রী দাঁতওয়ালা দল থাকে যারা পারিবারিক ভাবেই প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য। এদের হাতের লেখা, বাড়ির কাজ, অংক করে দেয়া থেকে যাবতীয় ফাই ফরমায়েস খাটার জন্য খুব ছোট্র একটা পরজীবি শ্রেনী সদা জাগ্রত থাকে। এই প্যারাসাইট শ্রেনীটাই আমার দুই চোখের বিষ। কলেজ লাইফেই যে সত্যটা আমি মারাত্মক ভাবে উপলব্ধি করলাম তা হচ্ছে বন্ধুত্ব। আমি দেখলাম, বন্ধুত্ব কত স্বল্প মুল্যে বিক্রি হয়ে যায় ! প্রেমিকারা একেবারে নির্লজ্জ পতিতার মত হাত বদল হয়। এখানে যারা প্রতারিত হয়, বাকি জীবনেও সেই তারাই বারবার বলির পাঠা-ই হয়। একবার যে পাঠা হয়ে জন্মে পরের জন্মেও সে বলির পাঠা হয়েই জন্মে। শুধুমাত্র মানুষ যেন আর আর ফিরে আসেনা। কেন যে তারা কুকুর হয়ে জন্মে না আমার বুঝে আসেনা। মানুষ কি কুকুরের চেয়েও বেশি কৃতজ্ঞতার প্রমান কোথাও কখনো রাখতে পেরেছিল? আমাদের নিয়তিগুলো কি দুর্ভাগ্যের ছকেই না বাধা!! দমে মরি দমেই বেচে উঠি। ঈশ্বর যেন বাকা হাসিতে তার ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি দেখিয়ে যান। হায় ঈশ্বর ! তুমি আমায় প্রলুব্ধ করতে পারোনি।

শীত আসার আগেই আমাদের পারিবারিক মিটিং বসল। ঘরের সব সদস্য উপস্থিত। বাড়তি হিসেবে আছেন ভাইয়ার চেলা গোছের এক ধুর্ত লোক। নাম পেয়ার আহমেদ মজুমদার। দুনিয়ায় এমন কোন বিষয় নেই যে বিষয়ে তার জ্ঞান বা বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। তার মত এত অল্প শিক্ষিত অথচ ট্যালেন্টেড লোক আমি জীবনে দেখিনি। মিটিংয়ে ভাইয়ার লম্ফঝম্প কোন গুরুত্ব পেল না। আমরা ব্যাবসায়ী পরিবার না। হসপিটাল দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল। আমি আর ভাইয়া সব ছেড়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হবার চেষ্টা করলাম। সে পোষ্ট গ্র‍্যাজুয়েশনে মনোযোগী হল, আর আমার সামনে আছে এডমিশন টেষ্ট।

যথারীতি পরীক্ষায় গোল্লা মেরে সে আবার মিটিং কল করল। হসপিটাল সে গড়বেই। আমরা সাথে থাকি বা না থাকি। মজুমদার সাথে থাকলে সে নাকি একলাই একশ। ব্যাক্তিগতভাবে আমার নিজেকে দোষী মনে হতে লাগল। যে লোক বাসার জন্যে এত কিছু করছে আর আমরাই কিনা তাকে এক প্রকার লাঞ্চিত করছি। এক গভীর রাতে উঠানে চেয়ার পেতে দুজনে কথা বললাম। গভীর রাতে পুর্নিমার চাঁদ যদি মেঘে ঢেকে যায়, তা যে কি অপুর্ব মোহনীয় হয়ে ফুটে উঠে তা বুঝিয়ে বলার সাধ্য আমার নাই। মনে হয় আকাশ জুড়ে একটা মাত্র সুর্যমুখী ফুল শুধুমাত্র আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠেছে। আমি ভাইয়াকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছি আর সে ঝটপট উত্তর দিয়ে যাচ্ছে।

আব্বা বলেছেন, মরে গেলেও তার সারাজীবনের সঞ্চয় তিনি হসপিটালের পেছনে ব্যায় করবেন না। তার ইচ্ছা শহরে একটা বাড়ি করা।

: আব্বাকে বল, দুই বছরের মধ্যে বাড়ি করে দেয়া হবে- ভাইয়ার উত্তর। আমি দুই দলের মধ্যে কখন যে দুতিয়ালিতে লেগে গেলাম টের পেলাম না।

আমাকে এসব বলে লাভ নেই। আমার কথায় আব্বার চিড়া ভিজবে না। আমি শুধু সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর গুলো শুনে রাখছি।

এর মালিকানা ফরমেট কেমন হবে বুঝিয়ে বলো।

: সবার সমান মালিকানা। দলিল হবে, সে অনুযায়ী রেজিষ্ট্রেশন হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। ডিড হবে।

-এটা কিভাবে সম্ভব। রাত দিন কষ্ট করবে তুমি আর শুধুমাত্র মালিক হবার সুবাদে আমরা সমান অংশীদারিত্ব ভোগ করব? তুমি বরং আলাদা করে স্যালারি এবং ডিউটি ফি নিও। তারপর যা যাকবে সেখান থেকে সাংসারিক খরচা বাদ দিয়ে প্রফিট শেয়ার কর।

: শুরুতে এত সিস্টেমিক ওয়েতে যাওয়া যাবে না। ক্লিনিক লাভে চলবে না লসে চলবে তারই ঠিক ঠিকানা নেই, আবার নিয়ম।

-নিয়মকে চালু রাখো। প্রয়োজনে তুমি ক্লিনিকের কাছে পাওনা থেকো।

: ঐসব পরে দেখা যাবে। আগে আব্বাকে টাকা যোগাড় করতে বল। শুক্রবার জমির মালিকের সাথে চুক্তি। অগ্রিম এক লাখ টাকা আর ফ্লোর প্রতি ভাড়া তিন হাজার টাকা। সব ফাইনাল করা আছে।

আমার কাছে মনে হল তার সাথে আলোচনা বৃথা। সে আর মজুমদার সব কিছুই ফাইনাল করে রেখেছে। আমার উচিত বাগরা না দিয়ে তাকে যে কোন মুল্যে সাহায্য করে যাওয়া। কাউকে রাস্তায় ছেড়ে দেয়া কোন দায়িত্বশীল কাজ নয়।

পরের শুক্রবারে দেলোয়ার নামের লুংগি পরা এক কিশোর, একজন মহিলা আর তার শক্তপোক্ত ভাই রশিদ ( সম্ভবত ) এসে হাজির। আমি প্রথমে মনে করেছিলাম এরা বুঝি ভিক্ষুক। পরে শুনি এরাই জমির মালিক। দেলোয়ারের বাপের মাথা খারাপ তাই তাকে না এনে মামুকে নিয়ে এসেছে। এরা গরুর গাড়ি চালায়। কুমিল্লায় গরুর গাড়ি আছে শুনেও পুলকিত হয়েছিলাম।

অগ্রিম এক লাখ টাকা নিয়ে রশিদ মামা ভেনিশ হয়ে গেলেন সেদিন রাতেই। পরদিন থেকে বিল্ডিং বানানোর কাজ শুরু হবার কথা থাকলেও কাজ শুরু হল না।

এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে বাবা আমাকে ছাড়া তার বাকি সকল সন্তানের মতামত নিয়েছেন। ভাই হলেন ভগবান। ভগবানের মাথার মনি আছে। কোন রকম বিরোধিতা ছাড়া এক ফ্যান্টম হসপিটালের নির্মান কাজ এগিয়ে চলল। টাকার যোগান দিয়ে যাচ্ছে পরিবার। আমাদের পরিবার।

এসবিসি/জেডসি