এ ডার্টি হিস্টোরি

 এ ডার্টি হিস্টোরি

জাকারিয়া চৌধুরী : শিলালিপি এমন এক নষ্টের খেরোখাতা যা কখনো কারো প্রিয় হবে না। এখানে কোন কাল্পনিক প্রিয়ংবদার প্রেমময় উপস্থিতি নেই। থাকবে রগরগে যৌন মিলনের বিকৃত উল্লাস, পড়ে যিনি অসন্তুষ্ট হবেন তিনি আমৃত্যু আমাকে অভিশাপ দিয়ে যাবেন অথচ অস্বীকার করতে হয়ত আসবেন না। এর সকল পর্বই যে এক পরিবারের গল্প, কাছের মানুষ কিংবা দহনে প্রজ্জলিত একক কোন শিখা তা নাও হতে পারে। আবার শুধুমাত্র পার্থিব সীমাবদ্ধতাগুলোই যে এখানে বলে যাব, তাও নয়।

ইদানিং বড় আশংকা হয় অনেক সত্য প্রকাশ করতে হবে ছলে বা কৌশলে। কিছুটা মনোবলে কিংবা শিলালিপির মধ্যেই নতুন শিলালিপির জন্ম দিয়ে অন্য কোন পরিবারের গল্প বলে। ফলে সবগুলো লিপির সম্মিলন শেষ হয়ে গেলে কেউ হয়ত দয়াপরবশ হয়ে বলতে আসবেন, কই দেখি। তোমার হিজিবিজির খাতাটা দাও তো। কী অবস্থা করে রেখেছো? চল, চলোতো ছাপিয়ে ফেলি। এ ভাবনায় ক্রসফায়ারের কথা খুব মনে আসে। সাধারণ মানুষ ধরে নিয়ে জলজ্যান্ত গুলি করে হত্যাকে সরকার বাহাদুর শুরুতে বলল ক্রসফায়ার, দিন কয় পরে ক্রসফায়ার হয়ে গেল এনকাউন্টার, এনকাউন্টার হলো বন্দুক যুদ্ধ, তারপরে হলো গ্রেনেডের গল্প। একই গল্পের কত কত রূপ! আজকের পর্বে যারা দু:খিত হবেন তাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, এ নষ্ট লিপির প্রতিটা লাইন, প্রতিটা শব্দ, প্রতিক্ষণ, প্রতিটা পল অনুপল নানান দু:খ-কষ্ট, আনন্দ বেদনার সংযোজন মাত্র।

আমাকে একটা অভিযোগ প্রায়ই শুনতে হয়, আমি দু:খবাদী। আমার গল্পগুলো নানান অভাব-অভিযোগ, অনুযোগ, রাগ-বিরাগে ঠাসা থাকে। হয়ত সঠিক। তবে আমাকে যদি বাদীর আসন ছেড়ে বিবাদীর আসনেও বসানো হতো, তখনো পাশা খেলার ছকের বিভিন্ন ঘরে নিজেকে বারবার বসিয়ে নানান নিরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করেছি; যা লিখেছি, যা বলেছি, অবিকল তা-ই বলে যেতাম। যে আচার আচরন, আবহাওয়া আর তার পুর্বাভাস আমি নিয়ত সহ্য করেছি, জীবনকে যদি রিভার্স করে দেখার সুযোগ থাকত, তখনো কি একই বিবেচনাবোধ কাজ করত? হ্যাঁ, করত। আমি কি আগে থেকে জানতাম শিলালিপি নামের কোন ছাইপাশ কখনো লিখতে বসব? তখনো নির্মোহ থাকার মরণ নেশা আমার ছিল, এখনো আছে। এ যেন সেই চক্করওয়ালার বিষ নিজের জিভে নেয়া, যে নেশা থেকে কারো মুক্তি নেই। যা হোক, অনেক বিরক্ত করলাম। গল্পে ফিরে যাই চলুন।

এডমিশন টেস্ট এর সময় চলে আসলো দেখতে দেখতে । যথেষ্ট পড়াশোনা নাই তহবিলে, এ সত্য আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম কোচিং করতে গিয়ে । ইয়াসমিন একদিন ডেকে নিয়ে বলল, তোমার তো মনে হয় কিছু হবেনা নাকি হবে ? আমি বললাম- হবে না মনে লয়। তাইলে তুঁমি তোমার পথ দেখ । খেইল খতম – এই নারী আমাকে ঝুলাইয়া রাইখা আমার তিন বন্ধুর সাথে প্রেম করেছে একে একে । আমি গাধা আশায় আশায় বুক বেঁধে বসে থেকেছি । নারী আমাকে বুলি শোনায়, ফিউচার নাই তো আমি নাই । আমি কোনমতে কষ্ট করে বললাম, যা আমার চোখের সামনে থিক্কা বিদায় ল । হারামি মা…, তোর মা মা…, তোর চৌদ্দগোষ্ঠী মা…, হারামির জাত । শেষ, সব শেষ হয়ে গেল । আমি নিরবে কেমিষ্ট্রিতে অনার্স করতে লেগে গেলাম । কিন্তু মন বিদ্রোহ করে বসল । তিন মাসে একদিনও ক্লাসে গেলাম না ।

৯৮ এর এপ্রিল মাস । বড় আপা বিরাট লটবহর নিয়ে হাজির কুরবানি ঈদ করার জন্য। আজকে এনএসইউ-তে পড়া আমার অতি প্রিয় মানুষ চয়ন তখন দুধ খায়। আমাকে গত সপ্তাহে কানে কানে বলল, মামা, আমি সিগ্রেট খাই। আমি যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। তার বয়স যেন কত হল ? একুশ নাকি বাইশ ? যাই হোক, জীবনে একটা ভালো উপলব্ধি আসলো। সিদ্ধান্ত নিলাম, এটাই করব। আপা ঈদ শেষে ফেরার পর তাঁর সাথে সিলেট চলে যাব । একমাস সেখানে থেকে পড়ব । পরের বার যেন খুব ভালো ভাবে এডমিশন টেস্টগুলো অন্তত দিতে পারি । তখনও এ বছরের সব টেস্ট শেষ হয়ে যায়নি । শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়য়ের পরীক্ষা সামনের মে মাসের ০৮ তারিখে । এপ্রিলের ১৪ বা ১৫ অথবা খুব কাছাকাছি সময়ে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে বসলাম ।

আপার সাথে নতুন বাচ্চা, কাজের লোক দুইজন। বৃদ্ধা শাশুড়ি, দুলাভাই এবং আমি । চারটা সিটে সবার ব্যক্তিগত ব্যাগ হাতে হাতে নিয়ে কোন রকম গাঞ্জাগুঞ্জি করে বসলাম । আমাদের সাথে আরও আছে বড় বড় তিনটা সুটকেস (সবগুলো সম্ভবত পাথরে ঠাসা), চারটা কাঁচা মাংসের ব্যাগ আর দুইটা প্লাস্টিকের বড় বড় ঝুড়ি (ঝুড়ি ঠাসা দুধের টিন, বাটি, চামচ, প্লাস্টিকের ফ্লাস্ক, বাচ্চার কাপড়চোপড়সহ হাজার রকমের হাবিজাবি)। ট্রেন থেকে নেমে দুলাভাই তাঁর বউ-বাচ্চা আর মাকে নিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করল । দুই কাজের মেয়ে দুইটা ব্যাগ নিয়ে সামনে বাড়ল। হায়রে কপাল! টনকে টন বস্তা নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর দুলাভাই হন্তদন্ত হয়ে ফিরেই চিৎকার শুরু করলেন, আমি কেন পিছিয়ে পড়লাম? পাঁচটা ব্যাগ কাঁধে পিঠে নিয়ে টলতে টলতে ট্যাক্সি পর্যন্ত গেলাম।

দিন দুয়েকের মধ্যেই জেনে গেলাম, অথর্ব শালা তার বোনের বাড়িতে থাকতে গেলে তাকে কেমন জীবনযাপন করতে হয়! সব মেনে নিলাম। সকালে আপা দুলাভাই কলেজে চলে যায়। আমি গরম দুধ বোতলে ভরে ভাগিনার সামনে বসে থাকি। সে দশটায় ঘুম থেকে উঠে একটা পর্যন্ত তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এক ফোঁটা দুধ বা অন্য কিছু মুখে নেয় না। আমি তার সামনে নাচি, গাই, কাঁদি, হাসি। সবই করি। সময়ের সাথে তার চিৎকারের পরিধি বাড়তে থাকে। কাজের মেয়েটা কোন সময় এসে একটু ছুঁয়েও দেখে না , মজা লয়। আপা একটার দিকে ফিরে প্রথম যে প্রশ্নটা করে, সেটা হল; তুই এতক্ষন আমার ছেলেরে কী করছস? সে এতো কান্দে ক্যা? ওর পিঠে-ঠোঁটে এতো লাল লাল দাগ কীসের? দেখি, তোর হাত দেখা। নখ দেখা। আমি দেখাই আর মনে মনে ক্ষয় হই। এই বোন আমাকে সারা জীবন কোলে কোলে রেখেছে। আর এখন সে কীভাবে কথা বলে! কীভাবে তাকায়! আমার ভয় করতে শুরু করল এটা ভেবে যে, যদি তাদের বাসায় চুরি হয় কখনো, তখনো কি আমাকে দোষারোপ করবে? ঘাড় ধরে বের করে দিবে? না মনে হয়। আপা কিছুতেই এটা পারবে না। পঞ্চম পর্বেই বলেছিলাম, আপার গল্প শেষ। আসলে শুরু বলে যেমন কিছু নেই, সম্ভবত শেষ বলেও কিছু নেই। সৃষ্টির শুরু থেকে অভিনয়ের যে মঞ্চায়ন শুরু হয়েছে, কালে কালে আমরা শুধুমাত্র অভিনেতা অভিনেত্রী হয়ে তাতে প্রবেশ করেছি। অভিনয় শেষে গ্রীন রুমে ফিরে যাই, যাকে মানুষ মৃত্যু বলে। জীবনের শুরু থেকে শেষ, সবটাই অভিনয়। আজকের পর্বটা শেষ করতে পারছি না। বারবার ঘুরেফিরে অন্যদিকে চলে যাচ্ছি।

দুপুরে ভাত খেয়েই পড়তে বসি। বিকেল হলে দুলাভাই ডাকতে শুরু করে তাড়াতাড়ি তাঁর সাথে বটেশ্বর বাজারে যাবার জন্য। নিয়মের বাইরে ভদ্রলোক কখনো চলেননি, ইস্ত্রি ছাড়া কাপড় পরেননি। নিয়ম তাকে নিয়মের ঘেরাটোপে বন্দী করে ফেলেছে। প্রতিদিন একটা মিষ্টি কুমড়া কিনে বাসায় নিয়ে আসি। পরদিন সকালে রুটির সাথে ভাজি হিসাবে, দুপুরে মাছের তরকারি এবং রাতে ডাল কুমড়োর ভটবটি তরকারি খাবার জন্যে। মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া! আমার জীবন হয়ে গেল মিষ্টি কুমড়াময়। এভাবেই টানা তেইশ দিন কোন রকমে পার করলাম দাঁতে দাঁত চেপে। কুমিল্লা থেকে সব বন্ধু সিলেটে এলো শাবিপ্রবি-তে পরীক্ষার জন্য। অনেক দিন পর এদের দেখা পেয়ে পাগল হয়ে যাবার জোগাড়। দৌড়ে বাসায় এসেই বইপত্র গোছাতে শুরু করলাম। সেদিন শুক্রবার ছিল। বাসায় ফিরে দেখি সুচিত্রার দহন ছবিটি বিটিভিতে দেখাচ্ছে। আপাকে কোনমতে বললাম, কাল সকাল সাতটায় কুমিল্লা চলে যাব। আর আজ রাতে হোটেলে থাকব সবাই এক সাথে। আর কোন কিছু না বলেই বইপত্র নিয়ে ভোঁ দৌড় । প্রচণ্ড হইহুল্লোড় করে রাত কাটালাম। সিলেটের মত হলি সিটিতে মাল জোগাড় হয়েছে, সে মাল খেয়ে টাল হয়ে সারারাত কীন ব্রিজে রিকসা ঠেললাম। প্রতি রিকসা ঠেলে উপরে তোলার ফি ছিল আট আনা কিন্তু স্টুডেন্ট বলে আমরা পেলাম এক টাকা করে। মাতাল মানুষেরা কত রকমের পাগলামি-ই না করে! সুস্থ্য পরিপাটি মানুষেরা সেসব করে না। সকাল ছয়টায় হোটেল থেকে বের হলাম ট্রেনের উদ্দেশ্যে। নাচতে নাচতে এসে দেখি, গেটে দুলাভাই হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। শুধু শুধু লোকটার উপর আমি রেগে আছি। অথচ সে ঠিকই আমায় বিদায় জানাতে এসেছে। তাঁর সাথে আমার নিম্নলিখিত কথাবার্তা হল ।

দুলাভাইঃ আজকে মজার একটা ঘটনা ধরা পড়ল।

আমিঃ সবই মজার ঘটনা। আপনে কী ধরলেন সেইটা আগে বলেন।

দুলাভাইঃ কাজের মেয়েটা নানান খারাপ কাজ যে করতেছে সেইটা আমি আর তোমার আপা ঠিকই আন্দাজ করছিলাম। কিন্তু কালপ্রিট ধরতে পারি নাই এতদিন।

আমিঃ এখন কি ধরা পড়ল?

দুলাভাইঃ মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি।

আমিঃ বাহ। ভালো তো। সে করছেটা কী? দুলাভাইঃ সে তোমার আপার বেশ কিছু কাপড় চোপড় আর টাকা চুরি করে আজ ভোর আনুমানিক ৫ টায় বাসা থেকে পালিয়েছে।

আমিঃ কী সর্বনাশ! পুলিশে খবর দেন। দুলাভাই, ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে আমি উঠলাম। পরে বাকি কথা বলব। বাই।

দুলাভাইঃ বাই। ইয়ে জাকু, সে কি তোমার সাথে যাচ্ছে? ট্রেন হেলেদুলে প্লাটফরম ছেড়ে বাইরে এসে পড়েছে। আমি জানি, এখন একটা দীর্ঘ বাঁক নিয়ে সে সিলেট শহরকে বিদায় জানাবে। তারপর কিছুদুর গিয়ে সোজা সাতগাঁও এর অভয়ারণ্যে ঢুকে যাবে। আমার ইচ্ছে হলো, জংগলে লাফিয়ে পড়ি। আমার ইচ্ছে হলো, ট্রেনে কাটা পড়ি। আমার ইচ্ছে হলো, পুরো ট্রেনটা আছাড় দিয়ে গুঁড়ো করে ফেলি। সোজা সামনের দিকে আমি তাকিয়ে আছি। ওইতো অজগর সাপের মত ধীরেসুস্থে সে বাঁক নিচ্ছে। মনে মনে বলছি, বিদায়। বিদায় হে পবিত্র শহর। শেষমেশ কাজের মেয়ে নিয়ে পালালাম?

৩রা নভেম্বর ২০১৩ ইং, রাত ৩ টা ৩৫ মি

এসবিসি/জেডসি/এসবি