পরিবারে বন্দী তৃণমূল

পরিবারে বন্দী তৃণমূল

এসবিসি রিপোর্ট : নির্বাচন সামনে। বিভিন্ন দলের ডাকসাইটে নেতাদের উত্তরসূরিরা নিজ নিজ এলাকায় নানামুখী কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যতোটা জানা গেছে, মনোনয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি হেভিওয়েট রাজনীতিবিদ ও এমপিদের উত্তরসূরিদের প্রাধান্য দিচ্ছে ১৪দলীয় জোটের প্রধান শরিক দল। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বেশ কিছু তরুণ এবং উদীয়মানকে মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই রাজনৈতিক নেতাদের ছেলে-মেয়ে রয়েছেন। এছাড়া খেলোয়াড়, অভিনয় শিল্পী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং ব্যারিস্টারও আছেন এ তালিকায়।

সর্বশেষ খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে বাগেরহাট-৩ সংসদীয় আসনটি ছেড়ে দেন সাবেক এমপি তালুকদার আব্দুল খালেক। স্বল্প সময়ের জন্য উপ-নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন তার স্ত্রী বেগম হাবিবুন্নাহার। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্ধিতায় ঐ আসন থেকে নির্বাচিত হন। সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট-৩ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলেই রয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মংলা-রামপাল এ আসনে তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সাল থেকে এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন বেগম হাবিবুন্নাহার। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এ আসনের সংসদ নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেক নির্বাচিত হন। উপ-নির্বাচনের জন্য গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সর্বসম্মতক্রমে এ আসনের উপ-নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেকের সহধর্মিনীকে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয় এবং তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় এমপি নির্বাচিত হন। নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী। তিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়েছেন। তার স্ত্রী নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুন নাহার শিউলী। নারায়ণগঞ্জ-১, রূপগঞ্জ উপজেলার (এমপি) গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক। স্ত্রী রুপগঞ্জ উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা গাজী রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার মেয়র।

নওগাঁ থেকে নির্বাচন করতে চান আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিলের ছেলে ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল (জন)। ইতিমধ্যে তিনি এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করছেন। বাবার ইমেজকে কাজে লাগিয়ে আগামীতে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য হতে চান তিনি। সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর আসন ফরিদপুর-২। এবার তার অসুস্থতাজনিত কারণে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করতে চান ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু। চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। বাগেরহাট ২ আসন থেকে আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে কাজ করছেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলালউদ্দিন এমপির ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়। সুদর্শন, হাস্যোজ্জ্বল এবং এবং সুবক্তা হিসেবে তন্ময় ইতিমধ্যে সবার দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। বাবা শেখ হেলাল বাগেরহাট ১ আসনের সংসদ সদস্য থাকায় তন্ময়কে বাগেরহাট ২ আসনের জন্য প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর আরেক নিকটাত্মীয় সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর ছেলে সাদিক আব্দুল্লাহ বরিশাল সদর থেকে নির্বাচন করার জন্য মাঠে কাজ করছেন। সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে ইতিমধ্যে সাদিক আব্দুল্লাহ মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা-চরভদ্রাসন-সদরপুর আসন থেকে এবারও নির্বাচন করতে চান বর্তমান সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় নিক্সন চৌধুরী। পরিবার কেন্দ্রিক নেতৃত্ব দক্ষিণাঞ্চলে: দক্ষিণাঞ্চলের চার জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে চলছে পরিবার কেন্দ্রিক নেতৃত্ব। সহযোগী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে এবং আত্মীয়স্বজনদের বসানো হয়েছে। পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা ও ভোলায় বেশিরভাগ পদে রয়েছেন সংসদ সদস্যের আত্মীয়স্বজনরাই। এর ফলে দলের ত্যাগী পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা পদবঞ্চিত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। তৃণমূলের পদবঞ্চিত এসব নেতারা বিষয়গুলো নিয়ে কেন্দ্রে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি। যে কারণে তৃণমূলের রাজনীতি খানিকটা স্থবির হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে পটুয়াখালী জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শাহজাহান মিয়া। ২০১৪ সালের সর্বশেষ সম্মেলনেও তিনি সভাপতি হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পরিবারের সব সদস্যকে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন তিনি। স্ত্রী মমতাজ বেগম জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ছেলে আরিফুজ্জামান মনি জেলা যুবলীগের সভাপতি, ভাগ্নে শহিদুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক। পিরোজপুরেও একই অবস্থা। সদর আসনের এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএমএ আউয়াল। পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র আবদুল মালেক এবং উপজেলা চেয়ারম্যান খালেক আউয়ালের সহোদর দুই ভাই। ভোলা-২ আসনের বর্তমান এমপি আলী আজম মুকুল। তিনি এমপি হওয়ার পর দৌলতখানের পৌর মেয়র হন মুকুলের বেয়াই জাকির হোসেন। বোরহানউদ্দিন পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের আরেক ভাগ্নে। একই অবস্থা বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগে। এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নিয়ন্ত্রণ করেন এই জেলা। এমপি শম্ভু জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। স্ত্রী মাধবী দেবনাথ জেলা মহিলা লীগের সভাপতি। ছেলে সুনাম দেবনাথ জেলা তরুণ লীগের সভাপতি। জাহাঙ্গীরের ভায়রা ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান বরগুনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

দুই পরিবারে বন্দী মুন্সিগঞ্জ জেলা আ’লীগ। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মহিউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমানের পরিবারের নিয়ন্ত্রণে মুন্সিগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতি। ৭১ সদস্যের জেলা কমিটিতে এ দুই পরিবারের সদস্য আছেন আটজন। দলের নেতা-কর্মীরা জানান, মো. মহিউদ্দিন ১৯৯১ সাল থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে এবং শেখ লুৎফর রহমান ১৯৯৬ সাল থেকে একটানা সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০০৫ সালের পরে জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১৪ সালের ২১ জুন। এই সম্মেলনে মহিউদ্দিন ও লুৎফর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হন। পরে মহিউদ্দিন ও লুৎফর রহমান তাঁদের অনুগত ও পছন্দের লোক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে পাঠান। সভাপতি হওয়ার আগে ১৯৮৪ সাল থেকে মহিউদ্দিন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৮৬ সালে মহিউদ্দিন প্রথমবারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হন। বর্তমান জেলা কমিটির সদস্য আছেন মহিউদ্দিনের বড় ছেলে ফয়সাল বিপ্লব। জেলা আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মহিউদ্দিনের ছোট বোন ফরিদা আক্তার। তিনি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগেরও সভাপতি।

প্রভাবশালী নেতা ও সংসদ সদস্যদের এই দাপটের মুখে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে জটিলতা হতে পারে অনেক জেলাতেই। তবে শেষ কথা হচ্ছে, বড়ো দলে নানান সমস্যা যেমন থাকে, সমাধানও তৈরি থাকে। আর তৃণমূল নেতাকর্মীরা এই পরিবারতন্ত্রের অবসান চাইছেন, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।

এসবিসি/এসআই/এসবি