জাকারিয়ার আত্মজীবনী

জাকারিয়ার আত্মজীবনী

জাকারিয়া চৌধুরী : একরাশ দু:খ নিয়ে সিলেট থেকে ফিরছি। সাতগাঁও ষ্টেশনে কোন কারন ছাড়াই ট্রেন কুড়ি মিনিটের মত দাঁড়িয়ে রইল। আমি আর আকবর পাশাপাশি সিটে বসে আছি। খলিল জিন্স, টি শার্ট এর উপরে তাবলীগের পাগড়ি পরা। থুতনিতে তাঁর সামান্য দাড়ি ঝুলছে। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না -সে সত্যি সত্যি তাবলীগ হয়ে গেল কিনা ! কয়েকবার চেষ্টা করেও তাঁর সে পাগড়ি খোলা গেল না। সেদিন এই পাগড়ি খুলে ফেলতে পারলে একটা ভবিষ্যত ট্র্যােজেডি এড়ানো যেত হয়ত। কিন্তু নিয়তির ইচ্ছা ছিল হয়ত ভিন্ন। সেই পাগড়িই একদা চট্রগ্রাম ষ্টেশনে তার জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছিল। সে অন্য গল্প। এটা ছিল মে মাসের ৯ তারিখ ১৯৯৮ সম্ভবত। শিলালিপি লিখতে গিয়ে অনুধাবন করলাম কথার প্রয়োজনে কত কথা যে আসে, কত কথা আগে পরে চলে যায়। আমি শুধু মিথ্যা, ভুল আর ভ্রান্তির কালো থাবা থেকে শিলালিপিকে মুক্ত রাখতে বদ্ধ পরিকর। সময়ের নির্ভুল ধারাবাহিকতা অনুযায়ী যদি শিলালিপিকে চালাতে পারতাম তবে এর কোন সত্যকেই হয়ত সম্পুর্ন করা যেত না। স্টেশন থেকে কুড়িটা লুচি কিনে নিলাম। ভাজি কেনার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিল।

ট্রেন সাতগাঁও ষ্টেশন ছেড়ে লাউয়াছড়ার অভয়ারন্যে প্রবেশ করেছে। যতবার এ অংশ অতিক্রম করেছি জীবনে ততবারই গা ছমছম করা একটা আধো আলো আধারির মধ্যে নিজেকে যেন বিচ্ছিন্ন এবং বিপন্ন অবস্থায় দেখতে পাই। কেন যে এত ভীতি, কেন যে অকারন শংকা আমাকে সর্বদা কুড়ে কুড়ে খায় বুঝিনা। যখন কোন সমস্যায় থাকিনা, তখনো দু:শ্চিন্তা নামক ভয়ানক এক দানব যেন এক কামড়েই ফালি ফালি করে ফেলে আমাকে। আবার যখন সমস্যার মুখোমুখি হই তখন দেখা যায় হয়ত আমি নির্ভোধের মত যেন গলিত ও চলন্ত লাভার মধ্যিখানের কোন ভ্যালিতে দাঁড়িয়ে আছি। পৃথিবীর তাবৎ অপরাধের সাজা যেন আমাকেই বয়ে যেতে হবে। এর জন্য যত জনম দরকার হয় তত জনমই আমাকে ভুগতে হবে। ষ্টেশনে ট্রেন লেট করবে বুঝতে পেরে অনেকেই নেমে সকালের খাওয়া সেরে নিয়েছে। সেদিকে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। আবার আমি যখন নামলাম- ট্রেন ততক্ষনে হেলে দুলে এগুতে শুরু করেছে। আমার মন পরে রয়েছে সিলেট রেল ষ্টেশনের গেইটে যেখানে টি সি রা সাদা কোট পরে টিকেট কালেকশন করে। ঠিক এই জায়গাটাতেই ফোল্ড করা একটা পেপার নিয়ে দাড়িয়েছিল দুলাভাই। ব্যাগ খুলে সদ্য কেনা ‘মাইন ক্যাম্পফ’ পড়তে চেষ্টা করলাম। ঝকঝকে তকতকে সাদা অফসেটে প্রিন্টেড বইয়ের গন্ধটাই আলাদা। নাকে লাগিয়ে সে গন্ধ শুকে দেখা আমার আদি কালের অভ্যাস। এখানেও এর কোন ব্যত্যয় দেখা গেলনা।

হঠাৎ করেই যেন ট্রেনের পেছনের দিক থেকে নানান চিৎকার, চেঁচামেচি, হইহুল্লোড়ের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। বইপত্র, পেপার, কলম হাতে যা কিছু ছিল ব্যাগে ভরে সুইস আর্মি নাইফটা হাতে নিলাম। বিপদের গন্ধ যত আগে আমি পাই তত আগে অন্য কেউ পায় কিনা জানিনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাল রকম আহত অবস্থায় আমাদের কয়েকজন সেয়ানা বন্ধু কামরায় প্রবেশ করল। আমরা সবাই যখন এক কামরায় নিজেদের মত সময় পার করছি, তাদের তখনো পুরো ট্রেন, ট্রেনের সকল মেয়ে যাত্রীদের দেখা, চোখ টিপা শেষ হয়নি। সেয়ানাদের দল ধরা খেয়ে এসেছে চিটাগাং থেকে সিলেট যাওয়া ছাত্রদের হাতে। ওরা আচ্ছা করে ট্রিট দিয়েছে। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এখন দোষ গুন বিচারের সময় নয়। আহতদের দেখভালের দায়িত্ব একদলের হাতে দিয়ে আমরা জনা দশেক নতুন সেয়ানা ওদের খুঁজতে গেলাম। দুই কামড়া পেরিয়েই তাদের সাথে দেখা হয়ে গেল। ওরা জনা পঞ্চাশ যেন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। মজার ব্যাপার হলো, আমরা জানতে এসেছিলাম সত্যিকারেই কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। তারা আমাদের দেখেই ধাওয়া দিল। আমাদের একজনের মাথা কেটে গলগল করে রক্ত পড়ছিল। আমরা প্রায় সমান সংখ্যক ছেলে নিয়ে যখন ফিরে গেলাম ততক্ষনে তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব দেখা দিয়েছে। একদল সুশীল হয়ে গেছে, আরেকদল আমাদেরকে সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। এ চিত্রটাই সবচে খারাপ লাগল। এ যেন ক্ষুদ্র এক বাংলাদেশ। জাতীয় দুর্যোগেও এরা এক হতে পারেনা। তাদের দলে অন্তত ত্রিশজন ছিল যারা পিছু হটেনি। এই দলটাই দেশপ্রেমিকের দল এবং আমি জানি, চিটাগাং ফেরার পর সবাই তাদেরকেই দুষবে। এক বারের জন্যেও ভাববে না যে, তারা জীবনের রিস্ক নিয়েছিল। এবার এক তরফা মারামারি হলো। বেদম মার খেয়ে ধরাশায়ী অবস্থা তাদের। আমরা যারা বেল্টের বারি খেয়েছি তাদের তেমন কিছু হয়নি কিন্তু দুয়েকজন বকলসের আঘাতে ভালই ইনজুরি হয়েছে। যা হয়েছে ভালই হয়েছে। পরিবেশ মোটামুটি শান্ত হয়ে এসেছে। পরের দুই ঘন্টায় ট্রেন অনেকটা নিরবেই যেন এগিয়ে চলে আখাউড়া জংশনে এসে থামল। আখাউড়া ষ্টেশন ছাড়ার পর তাদের পক্ষের সুশীলের দলটা আমাদের কামড়ায় এলো। দুই পক্ষের ভুল বুঝাবুঝির অবসান এবং শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছে তারা। আমরা তাদের সাথে কোলাকুলি করলাম এবং আমাদের একটা দল গিয়ে তাদের সবার সাথে দেখা করে জনে জনে দু:খ প্রকাশ করে এলো। তারপর যে যার কামড়ায় চলে গেছে ব্যাগ গোছগাছ করতে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ট্রেন কুমিল্লায় চলে এলো। সবাই যে যার মত নেমে পড়লাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। ঠিক এই সময় যেন একটা চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এলো টেন থেকে। কেউ একজন চেচিয়ে বলল আমাদের একজন মিসিং। সম্ভবত ট্রেনে আটকে রেখেছে। আমরা পাগলের মত ছুটলাম ট্রেন থামাতে। ট্রেন থামিয়েও দিলাম। একজন যে মিসিং তাকেও খুঁজে পেলাম। সেদিন চট্রগ্রামের ছেলেদের এই কাজটা খুব খারাপ হয়েছিল এবং এর মুল্য তারাই পরিশোধ করেছে। যা হবার হয়ে গেছে, এখন মূল গল্পে ফিরে যাই।

বাসায় ফিরলাম দুপুর দু’টায়। প্রায় ২৩ দিন পর। এত দীর্ঘ সময় পরিবার ছাড়া আগে কখনো থাকিনি। ঘরে ফিরে দেখি বড় ভাইয়া আব্বার ঘরে মুখ কালো করে খালি গায়ে শুয়ে আছে। তাকে দেখাচ্ছে লম্বা একটা পাট কাঠির মত। কেমন গুমোট একটা পরিবেশ।

-আজ অফিস নেই ? জিজ্ঞেস করলাম।

; কিছুক্ষন পর জহির ভাই আসবে। আমি তাকে কি প্রশ্ন করলাম, সে কী উত্তর দিল ! অবাক কান্ড! শিমপুরের জহির ভাই। এই লোক যে সাইজে জন্ম নিয়েছিল তারপর আর উচ্চতা বেড়েছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি, ভীষন ধুর্ত লোক। বাসায় ছোট মামা আছেন। দুনিয়ায় কিছু কমন লোক থাকে যাদের সাথে সবার সখ্যতা সমান। আমার এই মামা, জহির ভাই এই গোত্রীয়। ছোট মামার সাথে আমাদের সব ভাইয়ের সাথেই বিশেষ সম্পর্ক। সে লোক ভাল। খারাপ কিছু করার বৈশিষ্ট্য, ধরিবাজি কিংবা দুই নাম্বারি কোন বুদ্ধি উৎপাদনের মত মেধা তার ছিল না।

– জহির ভাই আসবে কেন ? সমস্যা কী ? কোন সমস্যা কি হয়েছে ?

– বিরাট সমস্যা। কাল ঝুমুরের বিয়ে। যা করার আমাকে আজকের মধ্যেই করতে হবে। আব্বা, আমার কথা কানেই তুলেনা। আমি যে তার বড় ছেলে….. আমার মত বুঝ যদি তার থাকত……. আহ। আহা, আব্বা একটা কমপ্লিট গবেট, এ ব্ল্যাক বেংগল গট।

আব্বা বারান্দা থেকে টিপ্পনি কাটল হসপিটালের প্রসংগ তুলে। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম- ভাইয়া রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেছে।

-ঝুমুর কে ? আবার জিজ্ঞেস করলাম। তাকে শান্ত করতে হবে আগে।

-সে চিটাগাং USTC তে থার্ড ইয়ারে পড়ে।

-বাসা কোথায়? কতদিন ধরে চেনো? আগে কেন কিছু বলোনি ? এখন কি করব ? বিয়ে হবে কিভাবে ? বিয়ে করার টাকা আছে তোমার কাছে ?

– আট’শ আছে পকেটে।

আট’শ টাকার পুজি নিয়ে যে লোকটি বিয়ের জন্য জেদ ধরে আছে সে একজন সরকারী ডাক্তার। হোস্টেল লাইফ ছেড়ে এসেছে অনেকদিন হয়ে গেল। মেডিকেল কলেজ স্যুভেনিরে ‘শ্রেষ্ঠ শিশু’ আখ্যা পাওয়া লোকটি বড় হবে কবে তা-ই ভাবছিলাম। তার সাথে এই নিয়ে কথা বলা না বলা সমান। সে যখন যা চায়, এমন মরিয়া হয়ে উঠে যে তার ইচ্ছার বাইরে কিছু করা সম্ভব না। হসপিটাল করতে গিয়ে ক’মাস ঘরকে নরকে পরিনত করেছিল। বাইরে বেরিয়েই দেখি আব্বাও আগুন হয়ে আছে। এই ঘরে যে যেদিকে যেতে চায় তাকে আটকানোর সাধ্য অন্য কারো নেই। সবাই গোয়ারের মত ছুটে। অতি নিম্নবিত্ত পরিবার গুলোকে দেখেছি। এরা সামর্থের তিনগুন বাচ্চা পয়দা করে। একটা কবিতা লেখে, একটা আবুল মকসুদের মত কাফনের কাপড় পরে, একটা অতিধুর্ত থাকে, মেয়েদের কোন না কোনটা বাবা মায়ের ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। আবার এই বাবা মা গুলো কি জানে, সমাজে ধুলো সমান ইজ্জত পাবার মত কোন অবদানই তাদের নেই? অথচ ইজ্জত খোয়ানোর টেনশনে এরা সারাক্ষন অস্থির থাকে। আহারে আমার ইজ্জর ওয়ালার দল ! মুতি তোদের কপালে !! ধার দেনার অত্যাচারে অতি আপনজনেরাও তাদেরকে রীতিমত ভয় পায়। তবু তারা নিজেরা নিজেদের মান সম্মানের ব্যাপারে ভীষন টনটনে থাকে। আব্বা হাত পাখা দিয়ে নিজেই নিজেকে বাতাস করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সেঝো ভাই বরিশাল মেডিকেলে পড়ে। সে কিছু জানে না, জানানোর কোন পথ নেই। একই সমস্যা বোন দুলাভাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

‘তাড়াহুড়ার বিয়ে কোনদিন ভাল হয় না। আমার ছেলে কি রাস্তার ছেলে যে তারা যা বলবে তাই করতে হবে? আমি এই বিয়েতে নাই, আমার সাফ কথা- আব্বার মুখে এই বয়ান শুনেই বুঝতে পারলাম সমস্যার শুরু এখনই হয়নি। তাদের হাংগামা হুজ্জোত হয়ত সকাল থেকেই লেগে আছে। ‘আজকে আমরা মেয়ে দেখি। আলাপ আলোচনা চলুক। তারা আমাদের খোঁজ নিবে আমরা তাদের খোঁজ খবর নিব………… মিন মিন করে বলে যেতে লাগলাম।

নাহ, নোয়াব সাবের সয় না। এক্ষুনি বিয়ে করতে হবে। যখন যা চায় তাই দিতে হবে। অতিষ্ট কইরা ফেলছে’- আব্বা মনে হয় আমাকে তার পক্ষে রাখার জন্য যুক্তি দিয়ে বয়ান দিয়ে যাচ্ছে।

– তোর কী  মত ? হঠাr করেই ভাইয়া যেন আমার দিকে ব্রহ্মাস্ত্র ছুঁড়ে দিলো।

কিছু না বলে নিজের ঘরে ফিরলাম। এটা সত্য এবং খুব ভালো করেই জানি যে, আব্বা যে গতিসম্পন্ন লোক, তার কথা মতে চললে এই মেয়ে নানী হবে কিন্তু আব্বার খোজ খবর করা শেষ হবে না। আবার ফিরে গেলাম আব্বার ঘরে।

ভাইয়াকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে বললাম। বললাম – জহির ভাই আসুক। চলো আআমরা মেয়ে দেখে আসি। তোমরা যদি মনে করো আজকেই বিয়ে করতে হবে, না হলে লংকাকান্ড হয়ে যাবে তবে তখন যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। আমরা তো একটা আশা নিয়েই যাচ্ছি। খারাপ চিন্তা করব কেন? ভাল চিন্তা করাই শুভ। টেনশন নিও না, সাথেই আছি’। মেঝো খালা, আগুল মামা, হাসেম খান এডভোকেটকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা আমাদের বাসার পথে। জহির ভাই সোজা ভাইয়ার সাথে কথা বলতে চলে গেলেন। তারা দু’জন কথা বলুক। আমি গোসলে ঢুকলাম। গোসল সেরে বের হবার পর জহির ভাই আমাকে জানালেন, বিয়ে করতে চাইলে আজই করতে হবে। মেয়ের আগামীকাল বিয়ে। চট্রগ্রামে ছেলের চারতলা বাড়ি আছে। তোমাদের কি আছে ? এত গরম দেখানো ভাল না। শেষ লাইনটা আব্বাকে উদ্দেশ্য করে বলা।

-ভাইয়ার পকেটে আটশ টাকা আছে। ড্রয়ারের গোপন তহবিলে কিছু আছে, আহামরি কিছু নয়। আমার পকেটে ছিল ১৬০০ টাকা। সেটা জহির ভাইয়ের হাতে দিয়ে বললাম- আজ আংটি পরিয়ে যে কোন g~ল্যে এক সপ্তাহ সময় নিয়ে আসুন। এর মধ্যে আপা দুলাভাই আর বরিশাল থেকে সেঝোকে আনিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। নিজের আপন ভাই বোনকে না জানিয়ে ঘরের প্রথম বিয়ে কিভাবে হয়, বলেন? মান সম্মত একটা আংটি আর দশ কেজি মিষ্টি নিয়ে যাবেন। আমি বাসাতেই থাকব। আপনাকে যা বলেছি তা আবার ভাইয়াকে বলে দিবেন না। হাংগামা বাধাবে।

রাত নটায় জরুরী খবর দিয়ে আমাকে নেয়া হলো। গিয়ে দেখি মহা ঝামেলা। মেয়ের বাপ মহা বেয়াদব। সে কাউকেই সম্মান দেখিয়ে কথা বলছে না। তার এক কথা- বিয়ে করতে চাইলে এক্ষুনি করতে হবে, নইলে বিদেয় নও। এইসব আংটি ফাংটির নাটক তিনি দেখতে চান না। মেঝো খালা পরিস্কার করে জানিয়ে দিলেন, তিনি শুধুমাত্র মেয়ে দেখতে এসেছেন। মেয়ে পছন্দ হলে আংটি পরাবেন। কিন্তু কোন বাধ্যবাধকতায় তিনি থাকবেন না। এই জটিলতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতেই মুলত আমাকে ডেকে আনা হয়েছে।

– ——- যান যান, আপনের আত্মীয়দের ঘুইরা ঘুইরা সুখবর বিলি করেন যে, বিয়ে হচ্ছে না। মেয়ের বাবার এমন অপমানসূচক  মন্তব্যের পর কোন ভদ্রমহিলা থাকবেন না জানা কথা। খালা একাই বেরিয়ে গেলেন।

আমরা বসে রইলাম। কারন পাত্র উঠবে না। নির্লজ্জের মত বসে থাকা ছাড়া আমাদের আসলে করণীয় কিছু রইল না। ভাইয়ার অবস্থা এমন যে, তার সামনে এক বাসন গু রেখে মেয়ের বাপে ইশারা দিলে সে তা-ই খেতে শুরু করবে। এই লজ্জাজনক অবস্থা না মেনে নিতে পারলেন হাসেম খান, না আগুল মামা। তারা দুজনেই আমার বাবার সমকক্ষ হওয়া সত্ত্বেও বারান্দায় এসে আমার কাছে সিগারেট চাইলেন। এক সময় তারাও চলে গেলেন। মোল্লা ডেকে বিয়ে পড়িয়ে রাত সাড়ে চারটার দিকে আমরা দলে বলে গু খেতে বসলাম। আমাদের জীবনে পারিবারিক ভাবে এই প্রথম একসংগে এক টেবিলে গু খাওয়ার শুরু। আমরা যেন, যন্ত্রনাময় কড়াই থেকে বাচতে লাফ দিয়ে উনুনে পড়লাম। ফ্রম দ্যা ফ্রাই প্যান টু দ্যা ফায়ার। এটা বুঝতেও সময় লেগেছে কমপক্ষে পাঁচ বছর। আমরা এমন এক সমাজ ব্যবস্থায়  জন্মেছি যেখানে পিছিয়ে পরা শ্রেণীটা এগিয়ে যাওয়ার জন্যে মরিয়া থাকে। এই ক্রেজি মনোভাব সামাজিক ব্যাবধানকে আরও বিস্তৃত করে। শ্রেনী বৈষম্য, অবিশ্বাস আর সন্দেহ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। জাতের মেয়ে কালো ভালো, নদীর পানি ঘোলা ভালো- কথাটা এমনি এমনি আসেনি। এ কথা আমাদের জন্যে যেমন প্রযোজ্য, তোমাদের জন্যেও প্রযোজ্য ; তুমি নিজেকে ছকের যে ঘরেই রেখে দেখো না কেন।

এসবিসি/জেডসি/এসবি