প্রফেসর’স ব্রিগেড

প্রফেসর’স ব্রিগেড

জাকির সোহান : হাসিব বাড়িতে এসেছে। তার কম্পিউটারের কাছে যাওয়া নিষেধ। রুম থেকে সব কম্পিউটার সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এমনকি মোবাইলও তার কাছে নেই। বাবা সব সরিয়েছে।  জাহানারা হক মোবাইলে নাদিয়াকে জানালো যে, হাসিব দু’দিন হলো বাসায় এসেছে। নাদিয়া দ্রুত হাসিবকে দেখতে এলো। নাদিয়াকে দেখে হাসিব ব্যাপক খুশি। দুজনে গল্প করতে লাগল।  একপর্যায়ে নাদিয়া বলল, কোন গেমসটা বেশি খেলতে?- আর.সি.এফ। আর.সি.এফ নামে আদৌ কোনো গেমস নেই। হাসিব মিথ্যে বলল। এই নামে গেমস আছে কি না তা না জানলেও নাদিয়া বুঝতে পারল, হাসিব মিথ্যে বলেছে। জাস্ট ভাব লাগানোর জন্য তার সাথে তাল মিলাতে বলল, এটা খেলতে খেলতে কি তুমি অসুস্থ হয়েছ?- জানি না।- এই গেমস আর কখনো খেলবে না। প্রমিজ করো।- গেমস ছাড়া তো জীবন অচল।- প্রমিজ করো এই গেমস খেলবা না। গেমস খেলেই তো অসুস্থ  হচ্ছো। নাদিয়ার অনেক অনুরোধের পর হাসিব প্রমিজ করলো, সে আর কখনো আর.সি.এফ গেমসটা খেলবে না। তবে অন্য গেমস খেলতে পারবে বাবা খেলার অনুমতি দিলে। জাহানারা হককে বলে হাসিবকে নিয়ে বাইরে হাটতে বের হলো নাদিয়া। হাসিবের সাথে একটু আরো বেশি ভাব লাগানোর জন্য নাদিয়া জানতে চাইলো, তুমি কি সব সময় একলা?- হ্যাঁ।- একলা একলা কী করো?- খেলি।- কি খেল?- গেমস।- এই কারনে তো অসুস্থ হও।- গেমস একা একাই খেলা যায়।- তোমার ফ্রে- নাই? ‘আছে।’ হাসিব একটু দুষ্টামি করে বলল, ‘কোন ফেন্ড?’ ফেন্ড মানে ফেন্ড।ফেন্ড তো অনেক প্রকারের। বয় ফেন্ড, গার্লফেন্ড ইত্যাদি, ইত্যাদি।- অনেক পেকে গেছ!- তুমিও তো।    দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে পার্কের কাছে এলো।

নাদিয়া বলল, এখন থেকে এক্সসারসাইজ করবা নিয়মিত। ঠিক আছে?

– জীবনেও এক্সসারসাইজ করি নাই।

– তাহলে তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাবে।

– তুমি এক্সসারসাইজ করো?

– হ্যাঁ।- তাহলে কি তুমি সারা জীবন ইয়াং থাকবে?

– তোমার মাথা। কথা না বলে পার্কে চলো। এক্সসারসাইজ করি।

– মাফ চাই।

– কেন?

– আমার অভ্যাস নেই।

– আজ থেকে শুরু করো।

– আমি জানি না কিভাবে এক্সসারসাইজ করতে হয়।

– বেশি কিছু নয়। আমার সাথে দৌড়াও। এটা তো পারবা?

নাদিয়া জোর করে হাসিবের হাত ধরে কিছুক্ষণ দৌড়াল। হাসিব সামান্যতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আর পারছি না। একটা বেঞ্চে হাসিবকে বসিয়ে নাদিয়া বলল, লক্ষী ছেলের মতো এখানে বসো। আমি একটু এক্সসারসাইজ করি। তুমি দেখে শেখার চেষ্টা করো। হাসিব হেসে বলল, হ্যাঁ, এটাই ভালো। নাদিয়া আধা ঘন্টা এক্সসারসাইজ করল। তারপর হাসিবকে নিয়ে ওর বাসায় এলো।

হাসিবের মাকে বলল, আন্টি, ও তো আজ এক্সসারসাইজ করেছে আমার সাথে।

– বলো কি! বিশ্বাসই হচ্ছে না।

হাসিব বলল, মা, হাঁপাতে গেছি। পানি দাও।

মা হাসিবকে পানি এনে দিলো।

জাহানারা হক নাদিয়াকে বললেন, তুমি মাঝে মধ্যে এসে ওকে একটু সময় দিতে পারবে না?

‘পারবো। খুব পারবো।’ নাদিয়া বুঝতে পারল হাসিবের মা তাকে খুব বিশ্বাস করছে। তাই প্রফেসর’স ব্রিগেডের জন্য দরকারি গোপন একটা বিষয় জিজ্ঞেস করল, হাসিব কি ওষুধ খায়?

–    ডাক্তার কোনো ওষুধ দেয়নি।

– আশ্চর্য!

– হ্যাঁ। কোনো ওষুধ দেয়নি।

– তার মানে ও পুরোপুরি সুস্থ ?

– ডাক্তার বলেছে আপাতত সমস্যা নেই। তবে এক  সপ্তাহ পর পর চেকাপ করতে হবে। আমি খুব খুশি যে, ছেলেটার কোনো সমস্যা নেই।

– যতো চেকাপ ততো টাকা।

– প্রতি চেকাপে মাত্র দশ লাখ করে লাগবে।

– আবার যদি আগের মতো অসুস্থ হয়ে যায়?

– ডাক্তার তো আছে। হসপিটালে ভর্তি করাতে হবে।

– হসপিটালে কি দিয়ে চিকিৎসা করায়?

– সেটা তো জানি না, মা।

– পেশেন্টের গার্ডিয়ানকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না যে।

– যখন গুরুতর কিছু ঘটে তখন দেয় না।

নাদিয়া ও হাসিব এক সাথে নাস্তা করল। এরপর হাসিব নাদিয়াকে গেট পর্যন্ত  এসে বিদায় জানালো।

নাদিয়া বাসায় এসে প্রফেসর আজহারকে হাসিব ও তার মায়ের সাথে আলাপের বিষয়টা খুলে বলল।

মামা বললেন, আমি বলেছিলাম না ওই ড্রাগস ওই হসপিটাল ছাড়া কোথাও পাওয়া যাবে না। মাঝে মধ্যে চেকাপের জন্য হাসিব যাবে আর সেই সুযোগে ডি ড্রাগস পুশ করবে তার শরীরে। কেউ বুঝবে না। এটা আমি বুঝতে পারছি আফ্রিকার ঘটনাটা ভালোভাবে জানতাম বলে।       আফ্রিকার ঘটনাটা মিডিয়ায় চাউর হতে পারেনি। বিশ্বে নামকরা কয়েকজন বিজ্ঞানী কেবল এটা জানেন। কিন্তু সবাই এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার নয়। একজন প্রতিবাদ করায় তাকে খুন করা হয়েছে। তিনি মামার খুব কাছের ছিলেন। আর একজন প্রতিবাদী হচ্ছেন প্রফেসর আজহার। মামাকে কেউ হুমকি দিয়েছে কিনা তা মামা ভালো জানে। হয়ত তিনি বিষয়টা গোপন রেখেছেন। মামার জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ল্যাবে গবেষণা করে। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের দরকার নেই তার। হঠাৎ খেয়াল চাপলো বিশ্বভ্রমন করবেন। ঘরকুনো আর ল্যাবকুনো মানুষটা বিশ্বভ্রমনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বটে কিভাবে যাত্রা শুরু করবেন সেটাই ঠিক করতে পারছেন না। হাতে অনেক সময় আছে জানতে পেরে নাদিয়ার জন্য দেশে আসা এক প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই। এসেই যখন পড়েছেন- তো বাংলা থেকে শুরু করতে চান বিশ্বভ্রমন।

বারো

রোমানা ব্রেসলেট দেখছে দোকানে। যমুনা ফিউচার পার্কে সে নাদিয়ার সাথে এসেছে। রোমানা দুইটা ব্রেসলেট নিলো। তারা কফি শপে ঢুকলো। কফি খেতে খেতে নাদিয়াকে একটা ব্রেসলেট গিফট করলো। নাদিয়া ব্রেসলেটটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে বলল, এটা ছেলেদের মানাবে।- তোর পছন্দ হয়নি?- সবই সুন্দর। কিন্তু ছেলেদের মানাবে ভালো।- তাহলে চল ফেরত দিই।- নাহ থাক কিনেছিস যখন।- তুই তো পড়বি না।- আমি না পড়লেও অন্যজন পড়বে। একজনকে গিফট করবো।- কাকে?‘হাসিবকে।’ হেসে বলল নাদিয়া।রোমানা ভ্রু কুচকিয়ে বলল, ওওও বেশ জমেছে রোমাঞ্চ।- খুব ভালো ছেলে।- হায় হায়। গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে তুই কি ধরা পড়লি!- বুকের মধ্যে কেমন রোমাঞ্চ জাগে। অন্য রকম ফিলিংস।- ভালো। সুখে থাক।- বিষয়টা তেমন নয়।- এতদূর এগিয়ে গেছিস আর বিষয়টা তেমন নয়?- হ্যাঁ। মিশন ঠিক আছে।- কিন্তু  মিশন চালাতে গিয়ে প্রেম প্রণয় হয়তো। সিনেমায় হয়। দেখায় আমরা দেখি।- ওর সাথে টাইম পাস করতে ভালোই লাগে।- লাগারই কথা। না লাগলেই সমস্যা। সমাধানের জন্য ডাক্তার দেখাতে হবে।দুজনে পেট চেপে হাসতে লাগল।নাদিয়ার ফোন বাজছে। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে বলল, ‘হাসিব। ওর মায়ের মোবাইল থেকে কল দিয়েছে।’‘চালিয়ে যা’ রোমানা বলল।      নাদিয়া হাসিবেব সাথে কথা বলতে লাগলো, কি খবর প্লেয়ার? আমি শপিং করছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, সন্ধ্যার আগে দেখা হবে। তুমি রেডি থেকো। বাই।’ ফোনে কথা শেষে রোমানাকে বলল, আমরা নিয়মিত সন্ধ্যায় এক্সসারসাইজ করছি। তাই নিয়ে কথা হলো। আজও হবে।    রোমানা জিজ্ঞেস করল, দিনে কতোবার কথা হয়?- হিসাব নেই।- বাবারে! বাধ ভাঙ্গা প্রেম!

রোমানাকে কোনো মতে তাড়াহুড়ো করে বিদায় দিলো নাদিয়া। বাসায় এসে নিয়ম ভঙ্গ করে সন্ধ্যা হওয়ার আগে আগে একপ্রকার দৌড়ে এক্সসারসাইজ করার জন্য রেডি হয়ে বেরুল সে। হাসিবের বাসায় এসে তাকে নিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর হাসিব বলতে লাগল, আর ভালো লাগছে না। চলো কোথাও বসি।- এত তাড়াতাড়ি?- হাঁটতে ভালো লাগছে না দৌড়াতেও না।- আবার গেমস খেলেছ নাকি?     নাদিয়ার প্রশ্নটা শোনা মাত্র হাসিব তেলবেগুনে জ্বলে উঠল, কক্ষনোই না!তার এমন আচরণে ভিমড়ি খেলো নাদিয়া। ‘রেগে যাচ্ছ কেন?’- গেমস খেলার কথা কেন বললে? এ্যা, জানো না গেমস খেলি না। বাবা কম্পিউটার, মোবাইল সব লুকিয়ে রেখেছে। কথা বলতে চাইলে মায়ের মোবাইল দিয়ে কথা বলতে হয়। তুমি জানো না? বলো, এসব তুমি জানো না?- জানি।- তারপরেও কেন বললা-আমি গেমস খেলি?- এমনি বলেছি।- তুমি আমাকে রাগানোর জন্য বলেছ। সরি, তোমার সাথে আড়ি।      হাসিব দূরে গিয়ে গালে হাত দিয়ে একটা গাছের তলায় বসল। নাদিয়া তার পাশে বসতেই সে উঠে কাঁদতে কাঁদতে বাসার দিকে চলল। হাসিবের দিকে নাদিয়া হা করে চেয়ে রইল। পকেট থেকে ব্রেসলেটটা বের করে আবার পকেটে রাখল।

রাতের বেলা নাদিয়া হাসিবের মাকে ফোন দিলো। হাসিবের মা ফোন রিসিভ করতেই নাদিয়া বলল, আন্টি, প্লেয়ারকে দিন তো।- প্লেয়ার আবার কে?- হাসিব। ওকে আমি প্লেয়ার বলে ডাকি। সন্ধ্যায় আমার সাথে মন খারাপ করে চলে এসেছে।- এখন তো দশটা বাজে। ও ঘুমাবে। বেশি কথা বলো না। ঠিকাছে?- ঠিকাছে আন্টি।     জাহানারা হক হাসিবের রুমে গিয়ে ফোনটা দিলেন। তিনি চলে আসার সাথে সাথে হাসিব ফোনে বলল, কি?মান ভাঙ্গানোর জন্য নাদিয়া বলল, হায় প্লেয়ার!- প্লেয়ার প্লেয়ার করছ কেন?- তুমি তো খেলা ছাড়া কিছুই পারো না।- কোন খেলা?- বলবো না।- বলো। না বললে সাড়া জীবনের জন্য আড়ি।- তুমি রাগ করবা না  তো?- রাগার মতো কথা বললে রাগবো।- মেয়ে মানুষের মতো করো না তো।- কি! আমি মেয়ে মানুষের মতো করি? তুমি তো মেয়ে মানুষ!- তুমি কিছুই বোঝো না।- বুঝি না ঠিকাছে, আমাকে বোঝাও।- তোমাকে একটা জিনিস দেবো।- কি?- আজই দিতে চেয়েছিলাম। তুমি হঠাৎ রেগে চলে এলে। আমার মনটা খারাপ করে দিয়েছ। খুব খারাপ লাগছে। মনটা ভেঙ্গে গেছে। তুমি যে এমন করলা তোমার মন খারাপ লাগছে না?- না।- আমার সাথে রাগ করতে ভালো লাগে?- হুম।- কেন?- এমনি। আগে বলো কি দিতে চাইছিলা।- কাল দেবো।- কখন?- যখন দেখা হবে।- এখুনি দেখা করি?- এখন তো রাত।- তাতে  কি? তুমি চাইলে এখুনি দেখা করতে যাবো।- না দরকার নেই। মা বকবে।- তুমি মন খারাপ করে আছো যে। এখন একটু হাসো।- কাল হাসবো।- এখুনি হাসো। নইলে বাসা থেকে বের হয়ে যাবো তোমার বাসার সামনে। তোমার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে চেচাবো।- ওরে বাপরে প্লেয়ারের কি সাহস!- তুমি আমাকে প্লেয়ার প্লেয়ার বলো কেন?- ভালো লাগে। কোনো আপত্তি? একটু অনিচ্ছুক স্বরে হাসিব বলল, না। ভালো লাগলে এ নামেই ডাকো।- ওকে প্লেয়ার।- আগে বলো কি দিতে চাইছিলা?- ছোট্ট একটা জিনিস। কাল দেবো।- জিনিসটা কি না জানলে রাতে তো ঘুম হবে না।- জেগে থাকো।- রাজি আছি। তোমার সাথে কথা বলব সারা রাত।- মা বকবে না?- বকবে। তাহলে কি করা যায়?- ধৈর্য্য ধরো। কাল সব হবে।       নিরুপায় হয়ে হাসিব ‘ওকে’ বলে ফোন রেখে দিয়ে কাঁদতে লাগলো নাদিয়ার জন্য।

হাসিব সারারাত ঘুমায়নি। ছটফট করে এপাশ আর ওপাশ করে কাটিয়েছে। ভোর হতেই বাসা থেকে বেড়িয়ে প্রথমবারের মতো নাদিয়ার বাসার সামনে দাঁড়ালো। বেশ কিছুক্ষণ পর আজহার মামা মর্ণিংওয়ার্ক করতে বেড়িয়ে হাসিবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাকলেন। হাসিব ঢুলুঢুলু চোখে মামার সামনে দাঁড়াল।   ‘কি চাই?’ মামার প্রশ্ন শুনে হাসিব ঘাবড়ে গেল। মামা আবার প্রশ্ন করলেন, রাতে ঘুমাওনি? সারারাত এখানে দাঁড়িয়ে ছিলে নাকি?- এই মাত্র এলাম। নাদিয়া আপুর সাথে কথা বলব।     ‘আচ্ছা দাঁড়াও’ বলে মামা বাসার ভেতরে গিয়ে নাদিয়াকে ডাকলেন। মামা মর্ণিংওয়ার্ক করতে গেলেন। নাদিয়া চোখ বড় বড় করে হাসিবের দিকে তাকালো। হাসিব রেগে বলল, ওভাবে তাকাচ্ছ কেন?- সাত সকালে আপনি?- সারারাত ঘুম হয়নি। কি জিনিস দিবা দাও তো!      নাদিয়া হাসতে হাসতে বলল, ওওওও, এই জিনিসের জন্য ঘুম হয়নি?পকেট থেকে ব্রেসলেটটা বের করে নাদিয়া হাসিবের হাতে পড়িয়ে দিলো। হাসিব খুশিতে দৌঁড়ে বাড়িতে ফিরে এলো।

তেরো

বলা নাই কওয়া নাই দুপুর বেলা নাদিয়ার বাসার সামনে তন্ময় দাঁড়িয়ে। বাইকে বসে নাদিয়ার সাথে ফেসবুকে চ্য্যাটিং করছে।- কেমন আছেন?- ভালো। এতদিন পর?- এতদিন  কই? আমি তো আপনার সাথেই আছি।- দেখা তো হলো না।- আমি তো দেখি।- তাই নাকি!- হুম- কই  এখন?’- কেন?- দেখা নাই তো তাই।- দেখতে  চান?- হুম।- দ্রুত বাসার বাইরে আসুন।         তন্ময়ের মেসেজটা দেখেই নাদিয়া আনন্দে চমকে উঠল। বলে কি! বুকের ভেতর কেমন একটা ফিলিংস কাজ করছে। কোনো দেরি না করে, সাতপাঁচ না ভেবে দৌঁড়ে গেটের বাইরে এলো। সামনে, ডানে-বায়ে তো কেউ নেই! তন্ময় নেই! হাওয়া হয়ে গেছে। তাকে খুঁজতে এদিক সেদিক তাকালো। ডানে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে একটা সাদা মাইক্রোবাসে কয়েকজন হ্যা-স্যাম তরুণ-তরুণী নাদিয়াকে কোনো কিছু বুঝতে না দিয়ে গাড়িতে তুলে নিলো। নাদিয়ার চোখ বাঁধা। মুখ বাধা। নাদিয়ার বুক ধরফড় করছে। মাইক্রোবাসটা অনেক পথ চলার পর একটা দোতলা বাড়ির ভেতর ঢুকল। বাড়ির একটা রুমে নাদিয়াকে চেয়ারে বসালো।  রুমে নাদিয়া একা। বিকেল বেলা নাদিয়াকে আবার চোখ-মুখ বেঁধে গাড়িতে তুলে গুলশানের নতুন বাজার পুলিশ চেকপোষ্টের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেল অজ্ঞাত তরুণ-তরুণীরা। গাড়ি থেকে নামানোর সময় চোখ, মুখের বাঁধন খুলে দিয়েছে ওরা। নাদিয়া রাস্তার পাশে বসে দম নিলো। কিছুক্ষণ ভাবল কি হচ্ছে। তারপর রিক্সা নিয়ে বাসায় চলে  এলো। মামা কিংবা মিডিয়া কেউ বুঝল না এদিকে কি হয়ে গেছে। রুমে শুয়ে রেষ্ট নিচ্ছে নাদিয়া।

সন্ধ্যায় মামারা ছাদে আড্ডা জমিয়েছে। মামা নাদিয়াকে ফোন দিলেন। সে ফোন রিসিভ না  করে সোজা ছাদে চলে এলো।                  সকাল থেকে বিকেলের সব ঘটনা মামাদের সব খুলে বলল, সবাই নিশ্চল, নিশ্চুপ।       মামা বলতে লাগলেন, তন্ময় নিশ্চয় কোনো গোয়েন্দা সংস্থার লোক। সবাই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করল।

পরের দিনের ঘটনা। সকাল বেলা থেকে শাহবাগে মিছিল-মিটিং হচ্ছে। রাত থেকে টিভি চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজ ছিলো- ‘প্রতিবাদী ছাত্রনেতা আসমাকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর পরিচয়ে কে বা কারা মেস থেকে তুলে নিয়ে গেছে।’ আর  তাকে ফেরত পাওয়ার দাবিতেই শাহবাগ উত্তপ্ত।সরকারের উপর প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে দেশি-বিদেশি ব্যক্তি, এন.জি.ও, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি চাপ দিচ্ছে। দুপুর নাগাদ পুলিশ জানাল, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

সন্ধ্যার পরপর কেরানিগঞ্জে দুজন র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত। র‌্যাবের দাবি, তারা মাদক ব্যবসায়ি। কিন্তু শাহবাগ আবার উত্তাল। সেখানকার প্রতিবাদিরা জানাল, আজ বিকেলের দিকে ওই দুজনকে ধরে নিয়ে যায় অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকজন। তারা পেশায় ডাক্তার। পদবিতে প্রফেসর। রাত তিনটা। নিয়ম মতো সারা দেশ ঘুমিয়ে। কেবল নিয়ম ভঙ্গ করে দেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বাসার ছাদে জরুরি মিটিং-এ বসল প্রফেসর’স ব্রিগেড।

এসবিসি/জেডএস/এসবি