মামণি হাসপাতাল শুরুর আগে

মামণি হাসপাতাল শুরুর আগে

জাকারিয়া চৌধুরী : এই কাহিনী মামণি হসপিটালের যাত্রা শুরুর আগের কথা। আগেই বলেছি, দেলোয়ারের মামা রশিদ চুক্তির রাতেই অগ্রিমের এক লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে ( অথবা এটা একটা সাজানো ঘটনা, যা ইচ্ছে হোক )। আমরা সকাল-বিকাল দেলোয়ারদের বাসা না বলে বস্তিতে গিয়ে বসে থাকি। রশিদ মামা যেন ভোজবাজির মত উবে গেছে। তার নাম-নিশানাও দেখা যাচ্ছে না। মজুমদারের ( পেয়ার আহমেদ মজুমদার, যার মেধার প্রশংসা আগেই করেছি। তাঁর সাক্ষাতকার নিয়ে রেখেছি। যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে )।

বাড়ির পাশেই দেলোয়ার, রশিদদের ঘরবাড়ি। আমরা শুরুতে মজুমদারকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, এর একটা বিহিত করতে। মজুমদার সারাদিন বাসায় ঘুমায়, সন্ধ্যায় দেখা করে সর্বশেষ পরিস্থিতি হিসেবে রশিদের আত্মগোপনের কথা-ই রেডিওর মত বাজায় প্রতিদিন। কিন্তু এমনভাবে আশ্বস্ত করে, তার কথা শুনলে মনে হতে বাধ্য, রশিদ আজকালের মধ্যেই আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। জাস্ট এ ম্যাটার অব টাইম। তাছাড়া রশিদের পেছনে পড়ে থাকা আর সময় নষ্ট করা একই কথা। এত সময় আমাদের হাতে নেই। প্রয়োজনে রশিদকে বাদ দিয়েই বিল্ডিং এর নেউ ( কাজ শুরুর প্রথম কোপ)  কাটা হবে। দেলোয়ার আর তার মা যদি কোন রকম হাংকিপাংকি করে তাইলে খবর আছে। আইনের প্যাঁচ মজুমদারের চেয়ে বেশি জানে, দুনিয়ায় এমন দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই। এ কথা সে প্রকাশ্যেই বলে বেড়ায়। মজুমদারের পরামর্শ মত আমরা যখন দেলোয়ারদের ঘরে যাই, দেলোয়ারের মা আমাদের দেখলেই মরাকান্না জুড়ে দেয়, উঠানে গড়াগড়ি খায় এবং যতবার প্রয়োজন হয় ততবার বেহুঁশ হয়। এই ফাঁকে দেলোয়ার চার রঙ এর চারটা কাপে লবণ-চিনি মেশানো চা এনে দেয় আমাদের হাতে। এরপর এক জোড়া সেন্ডেল আমাদের সামনে রেখে মাটিতে বসে পড়ে। আমরা বিদঘুটে চা খাবার পর দেলোয়ারকে সেন্ডেল পেটা করার কোন কারণ খুঁজে পাই না। অথচ নিশ্চিত জানি, রশিদ মিয়া আশেপাশেই কোথাও কোন ঘরে শুয়ে আছে। এরা প্ল্যান করে টাকাটা খেয়ে ফেলার চেষ্টায় আছে। আমরা আগে একবারও ভেবে দেখিনি, যে লোক গরুর গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতে পারত না, সে  কিভাবে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনে তিনতলা পর্যন্ত বিল্ডিং তুলবে! অবস্থাটা একপর্যায়ে এমন দাঁড়ালো যে, বিল্ডিং তোলার সামর্থ্য তাদের নেই, তার সব কিছুই তারা স্বীকার করছে কিন্তু করনীয় কী, তা বুঝতে পারছে না। আমরা এভাবে টাকা উদ্ধার বা স্থাপনা বুঝে পাবার আশা ত্যাগ করলাম। যা করার বিকল্প পথে করতে হবে। আমাদের বাসা শহরের পশ্চিম দক্ষিণ কোণে আর হসপিটাল করছি কিনা শহরের একেবারে উত্তর-পূর্ব কোণে। পাক্কা পাঁচ কিলোমিটারের দূরত্ব।

এই অবস্থায় এরে তারে ধরে সালিশের আয়োজন করতে হল। সালিশ বৈঠকের আগে যে স্থানীয় সর্দারদের নজরানা পাঠাতে হয়, তা তখনো আমাদের জানা ছিল না। সালিশের এক পর্যায়ে মনে হল, এখানে হসপিটাল করতে এসেছি তাদের হুকুম ছাড়া, আগে যেন সেটার বিচার শুরু হয়েছে! আফটার অল এই অঞ্চলে এখনো সর্দারি প্রথা চালু আছে। প্রথম বৈঠক কোন রকম সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হলো। দ্বিতীয় বৈঠকের আগের রাতে মজুমদারের কথামত দুই হাজার টাকা নজরানা পাঠানো হলো। সর্দারেরা সেই টাকা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। পরবর্তীতে সালিশ প্রতি পাঁচ হাজার টাকায় রফাদফা হলো এবং এবারে কাজও হলো। সালিশে সিদ্ধান্ত হলো, হসপিটাল করতে হলে তা আমাদেরকেই করে নিতে হবে। ফলে আগের চুক্তির সাথে নতুন কিছু ক্লজ যুক্ত করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে চুক্তি হলো। এছাড়া কারো আর কিছু করারও নেই। যেখানে হসপিটালের মালামাল কেনার পয়সা-ই আমাদের নেই, সেখানে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের বিল্ডিং গড়তে হবে। আব্বা যেন এই আশংকাটাই করেছিলেন। মানুষ রাগে অন্ধ হয়ে সর্বোচ্চ বিষ্ফোরিত হয়, আব্বা যেন জাপানের ফুজিয়ামোর মত লাভা উদগীরণ করতে শুরু করে দিলেন। আমি খুব অসহায় বোধ করতে শুরু করলাম।

সাতান্ন হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে হসপিটাল গড়ার যে স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, সেটা আজ যেন এক বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে! না পারছি গেলে দিতে না পারছি ছেড়ে দিতে। এ সময় মোস্তফা নামের অল্প বয়সী আরেক ধড়িবাজ উদয় হলো। সে ইট, সুরকি আর বালুর সরবরাহকারী।

‘যা যা দরকার শুধু ইশারা দিবেন ছার। টেকা পইসা আইজ আছে তো কাইল নাই। মোস্তফা টেকার ধার ধারে না। যহন যা পারবেন দিবেন। আমি শুধু প্রতিরাতে এক কাপ চা খাইয়া যাব। কোনদিন টাকা খুঁজব না’। এই ছিল মোস্তফার কথা বলার ভঙ্গি। মোস্তফা আমাদের সাথে দেখা করেছে শুনে কিছু লোকের বেহুঁশ হবার যোগাড়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মোস্তফা আসলেই বিরক্ত করেনি। সে হাসি মুখে কথা বলত, পান খেত প্রচুর এবং ৪০-৪২ বছর বয়সে এক রাতে বিনা নোটিশে মারা গেল। কার অনুভূতি কেমন হয়েছিল জানি না, আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। রাতদিন পাওনাদারদের অত্যাচারে এতটাই সন্ত্রস্ত থাকতাম যে, সন্ধ্যার পর মোস্তফাকে দেখলে আশা জাগত। অপরিচিত এই মানুষটা সমাজে কেন যে কীট হিসেবে পরিচিত, সেটা আমার বুঝে আসত না। শুধুমাত্র সে আসলেই কেবল কিছুটা স্বস্তি আর ভরসা পেতাম। এভাবেই খুঁড়ে খুঁড়ে, ঘুরে ঘুরে, হাতে পায়ে ধরে, বেচা বিক্রি, ধারকর্জ আর ভগবানের ভরসায় বিল্ডিং এর কাজ শুরু হয়। শুরুতেই এমন নানা হুজ্জোত চারদিক থেকে উদয় হতে থাকে যে, আমাদের দিন শুরু হয় রাম নাম সৎ হ্যায়…. রাম নাম সৎ হ্যায়… এই শ্লোক আউড়ে। উপশহরে বা শহরতলীতে বসবাসকারী শ্রেণী থেকেই পৃথিবীজুড়ে সন্ত্রাসের বীজ ছড়িয়ে পড়ে। কুখ্যাত সব সন্ত্রাসী, সিরিয়াল কিলার, কন্ট্রাক্ট কিলারদের জীবন শুরুই হয় ময়লা স্যাঁতসেঁতে বস্তি, বস্তি সংলগ্ন শহুরে অনুন্নত এলাকা থেকে। এসব অঞ্চলের মানুষগুলো বড় অদ্ভুত। দশ টাকার জন্যে যেমন পায়ে ধরতে পারে তেমনি দশ টাকা পকেটে পড়লে বাসায় ফিরে পাজামা পাঞ্জাবি, সুরমা, আতর মেখে মেথরপট্টিতে চলে যায় তিন গ্লাস মদ খেতে। খুব বেশি বিপদে পড়ে গেলে রাতের বেলায় রিক্সাও চালায়। এদের কারো বউ-ই হয়ত এলাকার জনপ্রিয় চম্পা আপা। মাল বেচে দেদারসে কামাই করে, আবার শুণ্য হয়ে যায়। আবার বেচে, ধরা খায়, মাল বেচার সাময়িক দায়িত্ব নেয় চম্পার বোন চামেলি। সেই কালো চামেলি, যে কিনা আমার জিনিসটা ব্লাউজের ক্লিভেজে লুকিয়ে রাখত। তার বুকের গন্ধ আমি এখনো পাই। আমি জানি, কিশোরীদের বুকের গন্ধ যুবতীদের মত পারফিউমড কোন ফ্যাশন নয়, ওটা মৌলিক মুখশ্রী। ফ্যাশনের মত কোন অস্থায়ী বদ মুখোশ নয়, এটা চিরন্তন- এটাই স্টাইল। বাবার জমি বিক্রি হতে টাকা এলো, পেনশনের টাকা এলো, পিএফ-এর টাকা এলো। সারা জীবনের সঞ্চিত টাকাও এক সময় এলো এবং দেদার‍সে খরচ হতে থাকলো।  চলুন প্রিয় পাঠক মূল গল্পে ফিরে যাই।

দিনে দিনে অবস্থার অবনতি হতে লাগলো। আগে দূর থেকে গালমন্দ চলত, এখন চিনকি মাজারের খাদেম নজিরা আমাদের নির্মাণাধীন বিল্ডিং এর কাজের স্থানে গাঁজা খেয়ে ঘুমিয়ে থাকে। তাকে ঘাঁটানোর সাহস কেউ করে না। সে নাকি স্বপ্নে নতুন রক্তের গন্ধ পাইছে। সারাদিনে কাজ যতটুকু এগোয় রাতের বেলায় তার চেয়েও বেশি ভেঙ্গে ফেলে রশিদ মামু। বিল্ডিং-এর কাজ শুরু হবার পর থেকে প্রতি রাতেই রশিদ মামু এসে হিসাব কিতাব চেক করে। এইটুকু কাজের জন্য নিয়ম করে দুইশ’ টাকা নেয় প্রতিদিন। তারপর গভীর রাতে মদ খেয়ে চুর হয়ে ফেরত আসে বিল্ডিং ভেঙ্গে ফেলতে। তাঁর এক কথা, সরকারী গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের আশে পাশে কোন স্থাপনা করা সরকারের নিষেধ। এই নিয়ম সে ছাড়া আর কেউ জানে না। রশিদকে নিয়ন্ত্রনের পর রিকশাওয়ালা আকছির মিয়াও একদিন অর্ধেক তোলা দেয়াল ভেংগে ফেলল। যেটুকু ভাংগা গেল না, সেটুকু হাতে ঠেলে একাই নাকি সে  বিল্ডিং তিন হাত সরিয়ে দিয়েছে দাবি করল। তার দাবি লিগ্যাল। এই স্থাপনা সরকারী গ্রান্ড ট্রাংক রোডের উপর উঠে গেছে। সুতরাং, আকছির আলী বেঁচে থাকতে সরকারের কোন ক্ষতি  মেনে নেবে না। পরদিন সকালে কোনমতে চোখমুখ ধুয়ে ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করতে যাই, রাতের ট্র্যাজেডি শুনি। হাসব না কাঁদব, বুঝে উঠতে পারি না। দীর্ঘ একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ তখন প্রথমবারের মত ক্ষমতায়। ফেনীতে হাজারি বাহিনীর ক্লাস কমিটির সদস্যরা ড্রিল মেশিন দিয়ে অপনেন্টকে হত্যা করছে, নারায়নগঞ্জে শামীম এবং লক্ষীপুরের তাহের বাহিনী একেকটা কাণ্ড ঘটায় আর আমরা ভয়ে কুঁচকে থাকি। রাস্তার সামান্য টোকাই, তাদের মা বাপ ভাই বোন সবাই লীগ। গরমে তাদের ধারে কাছে যাওয়া যায় না। তারপরেও মানইজ্জত শিকেয় তুলে তাদের পিছু পিছু ঘুরি। অজিত গুহ কলেজের সাবেক এজিএস খোকনের মার্ডার নাকি ঠিক এই জায়গাটাতেই হয়েছে। সে মামলার এক নাম্বার আসামী নূরে আলম পিংক কালারের লুংগি আর সাদা শার্ট পরে রাস্তার অপর পাশে বসে থাকে। সারাদিনে একবারও সে অন্যদিকে চোখ ফেরায় কিনা সন্দেহ আছে। কী এত দেখে দলবল নিয়ে? নানারকম দুর্ভাবনা মাথার মধ্যে যেন সারাক্ষণ কিলবিল করে। পুরো দলটার সাথে মজুমদারের মারাত্মক সখ্য এবং শুধুমাত্র মজুমদার গেলেই আরেকটা চেয়ার আনা হয় বসার জন্য। তা না হলে তার সাগরেদেরা ভুলেও নূরে আলমের সামনে বসার স্পর্ধা দেখায় না। কাটাবিলের জালাল গুণ্ডার দাবি সামান্য, কুড়ি হাজার টাকা মাত্র। নোয়াখাইল্লা বুড়ার দাবি হাজার দশেক। শুধুমাত্র নূরে আলম আর চিনকি পীর মাজারের খাদেম নজীর এখনো কিছু দাবি করেনি। তাদের মোটিভ কিছুতেই ধরতে পারছি না। মজুমদারের ভূমিকাও দিনে দিনে যেন রহস্যময় হয়ে উঠল। আমি তাকে পাত্তা না দিয়ে এড়িয়ে চলব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু ততদিনে ভাইয়া আরেক সর্বনাশের বীজ বুনে দিয়েছে স্বয়ং মজুমদারের মাথায়। ‘কতদিন আর অন্যের গোলামী করবেন মজুমদার সাব, এবার নিজে কিছু করেন। চলেন আমরা আমরা একটা হসপিটাল দেই। পয়সার মালিক হতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে হবে। কি ঠিক কিনা?  এই বক্তব্যের ভিত্তিতেই মজুমদার আগের চাকরি ছেড়ে আসছে বলে দাবি করে। চাকরি সে ছেড়ে এসেছে নাকি চলে গেছে তা জানি না। ভাইয়া মজুমদারকে কী বলেছে, তা নিশ্চিত ভাবেই জানি। আমি যখন তাকে এড়িয়ে চলছি সে ততক্ষণে আমাকে পাত্তা না দিয়ে চলা শুরু করেছে। ছাপ্পান্ন বছর বয়সী ধড়িবাজ মজুমদারের কাছে ঊনিশ বছর বয়সী আমি সামান্য এক শিশু ছাড়া কিছুই নই, এটুকু বুঝ আমার আছে। ভাইয়ার নেই।

প্রতিদিন ভোর সাতটায় কনস্ট্রাকশন এরিয়াতে যাই দুজনায়। ঠিক আটটা বাজার মিনিট দশ আগে ভাইয়া লাকসামের দিকে রওনা দেয়। সরকারী চাকরি বলে কথা, নো হাংকিপাংকি। দুপুর একটায় লেবাররা লাঞ্চ ব্রেক নেয় এক ঘণ্টার। জনে জনে টিপসই দিয়ে আমার হাত থেকে টাকা নিয়ে যায়। পাঁচটা বাজার আগেই সবাই দিনের মজুরীর টাকা নিতে লাইন ধরে। দেদারসে টাকা খরচ হচ্ছে এবং সারাদিনের হিসেব লিখে রাখছি নোট বইয়ে। লেবারগুলো ঠিকমত কাজ করে নাকি ফাঁকি দেয় আমি বুঝতে পারি না। গত ক’মাসে শুধু এটুকু বুঝেছি যে, এসব এরিয়াতে বিল্ডিং তোলা যে কত হুজ্জোতের কাজ তা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। ছোট্ট একটা উদহারণ দিলেই আপনারা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারবেন। একদিন বলা নেই কওয়া নেই, স্থানীয় চালের আড়তদার এসে হাজির। সংরাইশের ওরস উপলক্ষে আমাদের পক্ষ থেকে দুই বস্তা চাল নিয়ে গেছে মাজার কমিটি। এখনো টাকা কেন দোকানে পাঠিয়ে দিলাম না, সে কৈফিয়ত চাইছে সে। বাকি রইল ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগসহ তাদের দেবর ভাসুরের দল। শোক অনুষ্ঠান করবে। একই অনুষ্ঠান সবাই আলাদা আলাদা ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং, ব্যবসা করতে চাইলে সবাইকে টাকাও দিতে হবে আলাদা আলাদা। আবার পঁচিশ ফুট লম্বা কালো ব্যানার টানাতে হবে নিজ খরচায়। আমার কাছে একে সাউথ ইন্ডিয়ান প্রাচীন স্তনকর ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না। অভিজাত বামুনেরা এই নিয়ম চালু করে দিয়েছিল এক সময়। মেয়েদের স্তন ঢাকতে হলে কর দিতে হবে কিন্তু বামুনেদের বেলায় এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বিরক্তিকর বিষয় হচ্ছে, ভাইয়া উপস্থিত থাকাকালীন কর সংগ্রাহকরা কেউ আসে না। উনি চলে যাবার পর সবাই আমার উপর হামলে পড়ে। মানসিক প্রেসার লেভেল বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় উপনীত হলাম যে, বিকেল হবার আগেই আমাকে কয়েকবার ঠাণ্ডা পানিতে চুলসমেত মুখ ধুতে হয়। সন্ধ্যের পর তাকে দিনের হিসেব বুঝিয়ে দিতে গিয়ে আমাকে সেদিনের শেষবারের মত নাজেহাল হতে হয়। সে অযথাই চিৎকার করে। ‘সিমেন্টের টাকা আজ দিলি কেন?  সে কয় ব্যাগের দাম পায়? আমি চুপ থাকি। তাকে বুঝানো সম্ভব নয় সারাদিন কী পরিমাণ ধকল আমাকে পোহাতে হয়। তাকে বলতে পারি না, মজুমদার কোন কিছুরই দেখভাল করেনা। সারাদিন নূরালমের সাথে রাস্তার ওপারে বসে থাকে। এমনকি সেও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ভাইয়াকে বুঝানো যায় না, সামান্য এক ব্যাগ সিমেন্ট যার দাম মাত্র একশ’ দশ টাকা, সে টাকার জন্যেও দিনে দশবার লোক পাঠায় দোকান মালিক। তার বোঝা উচিত আমার বয়স উনিশ ছুঁয়েছে মাত্র, পার হয়নি। তাকে এটা বলতে পারছি না যে, এডমিশন টেস্টের বাকি আছে আর তিন মাস মাত্র। রোদে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন কাজের তদারকি করতে করতে এক সময় বিষাক্ত এক প্রকার জ্বরে আক্রান্ত হলাম। আমি এতটাই ক্লান্ত শ্রান্ত আর বিধ্বস্ত ছিলাম, পুরো এক সপ্তাহ শুধুমাত্র ঘুমিয়েই কাটালাম।

এসবিসি/এসবি