বিক্রিত বিকৃত মানবতা

বিক্রিত বিকৃত মানবতা

জাকারিয়া চৌধুরী : আগের পর্বে কথা শেষ করেছিলাম এই বলে যে, নৌকা, বিয়ে আর ঘর বাঁধার কাজ খুব সাবধানে এগুতে হয়।  ঘর বাঁধা বলতে সংসার যাত্রাকে যেমন মিন করে, তেমনি সে চলমান যাত্রায় যে বসতের প্রয়োজন তাকেও মিন করে। সংসার যাত্রার নিরবিচ্ছিন্ন এবং ধারাবাহিকতার যে ছন্দময় গতি, সে গতিও এক সময় আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম ( এটা কোন অতীতের কথা নয়।  এ হচ্ছে ঘটমান বর্তমান।  প্রসংগ এসেছে বলেই কিছুটা বলে রাখছি।  যথা সময়ে এর ডিটেইলস বলব। ) অন্যের বাড়িতে বাধা পশু হয়ে গোলামীর যে জীবনে অভ্যস্ত হতে হয়, তা সব স্বাধীন পশু মেনে নিতে পারে না।  কেউ দড়ি ছিঁড়ে পালায়, কেউ অবিরাম চেষ্টা করেই যায়।  যে কিছুতেই পারে না সে হয়ত অকালে মরে।  আমার বেলায় এ দুটোর কোনটিকেই স্পষ্ট করা হয়নি।  আমি বুঝি, মানুষের গর্ভে জন্ম নেয়া পশুরা কিছুটা হলেও বুঝে, যারা পশু হিসেবেও জন্মাতে পারে না তারা কিছুই বুঝে না।  যাকে ঈশ্বরের মত পূজা করে বেড়ে উঠেছি, সে বড় ভাই যে আমার ঢাকায় ( বারিধারা, বসুন্ধরায় ) থাকার একমাত্র বসত ভিটে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বলবে : তুমি ছোট মানুষ, আমার কাছে জমির কাগজ আর কাস্টডি দাও।  তুমি আরেকটু বড় হলেই তোমাকে সব কিছু ফিরিয়ে দেয়া হবে।  শুধু অনুরোধ থাকবে তুমি হসপিটালের শেয়ার চাইতে এসো না।  আমাকে হসপিটাল নিয়েই থাকতে দাও।  আমি লজ্জিত বোধ করেছিলাম এটা ভেবে যে, ভাই আবার ভাইয়ের কাছে হিসেব চায় নাকি ! এই মহাধূর্ততা আজ থেকে একযুগ আগে বুঝিনি।  সম্ভবত এ সময়ে-ই মা মনির একটা জাল দলিল তৈরী হচ্ছিল খুব গোপনে।  আমি যখন এসব জানলাম ততদিনে যুগ পার হয়েছে।  আমি আমার ঢাকার জমি বিক্রি করে সন্তানের চিকিৎসা করাতে বিদেশে নিয়ে যাব।  বাসায় এসে জিজ্ঞেস করে আকাশ থেকে পড়লাম।  দুই ভাই যারা দুজন আপন ভায়রাও, পারস্পরিক যোগসাজশে সব কিছু সম্পন্ন করেছে।  আমি জানি , অপরাধ নিষ্কণ্টক হয় না। ধরা পড়বে দুটোই।  শুধু সময় মত আমার একমাত্র বাচ্চাটা চিকিৎসার অভাবে আজীবনের জন্য………………।

আগে যদি বুঝতাম, মানুষের পক্ষে কোন লেভেলের পাপী হওয়া সম্ভব তবে নিশ্চয়ই সাবধানে থাকতাম।  তারপরেও ধরা খেতাম।  আমার পক্ষে এতটা পিশাচ হয়ে উঠা কখনো-ই সম্ভব হতো না।  যদি বুঝতাম তবে সংসার এবং পিতৃপরিচয়ের সংকটজনিত বেদনা কিছুটা হলেও স্মৃতিময় হতে পারত।  আমাকে যেন অবাধ্য, অকার্যকর বাঁধা পশু বানিয়ে শিকার করা হয়েছে দু’দিক থেকেই।
আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই, নবম পর্ব শেষ হয়েছিল একজন ক্লান্ত, শ্রান্ত, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এবং জ্বরে কাবু হয়ে যাওয়া শ্রমিক হিসেবে।  কিছুটা যখন সুস্থ্য বোধ করলাম, প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এলো, তা হচ্ছে গত এক সপ্তাহ কাজের অগ্রগতি কতটা হয়েছে? নাকি কাজ বন্ধ নাকি অর্থাভাবে সেটি অচল স্থবির হয়ে রয়েছে ? মজুমদার দিনে দিনে বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে।  জানি, মজুমদারের দাবি মিথ্যে নয় কিন্তু মোটিভ খারাপ।  তার ইতিহাস ঘেঁটে যা পেলাম তা বেশ চমকপ্রদ।  যে কোন ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, মার্কেটিং করা, উচ্চতার বেশ উঁচু একটা শিখরে পৌছে দেয়া পর্যন্ত মজুমদার একজন এঞ্জেল।  তারপরেই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায় সে।  কারো সাথে কথা নেই, বার্তা নেই।  শুধু চা আর সিগারেট টেনে যাওয়া ছাড়া তার আর কোন কাজে মনযোগ থাকে না। ডাকলে সাড়া দেয় না, সে যেন হাজার বছর প্রাচীন কোন জবুথবু বনসাইয়ে পরিণত হয়।  ইচ্ছে ছিল, তার পাঁচ/ছয় মেয়েকে আমরা কোন না কোন ভাবে প্রোভাইড করব।  ইচ্ছে এমন অনেক থাকে।  ইচ্ছে ছিল, বি-বাহান্ন আর মিগ-একুশ গুলো গুমগুম করে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাবে, এবং স্যালুট করবে কেবল তোমাকেই প্রিয়তমা………।

ফাঁকে একটু নিজের কথা বলি।

বুকের উপর সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুনা বলেছিল……। বাড়িতে যাবে শুনলেই দাউ দাউ করে বুকে জ্বলে উঠে প্রভুত দহন, দেখছ না প্রতি সপ্তাহে একদিন কেমন রণমূর্তি ধারণ করি !! কেন জানো ? আমি এত সৌভাগ্যবতী কেন?  সত্যি চলে যাবে না তো? আমি সেই ৯৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নির্বাক তাকিয়ে থেকেছি।  আমি জানতাম, পরিণতির গল্প আমি খুব ভাল করেই জানতাম।  জমি এবং পারিবারিক সম্পত্তি হারিয়ে গেছে, সন্তানের চিকিৎসা হবে না- বরুনাও একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেল একেবারে কাগজে পত্রে।

সরি, কথা বলছিলাম মজুমদারের।  সে কথাতেই বরং থাকি।  বনসাই মজুমদার, তারপর হঠাৎ একদিন মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।  শুরু করে ঝামেলা।  যারা তার নিয়োগকর্তা থাকে, তারা অবশ্যই তার চেয়ে কোন না কোন দিক দিয়ে ভারী হয়।  মজুমদার পেরে উঠে না।  এক সময় চাকরি চলে যায়।  মজুমদারের বউ দৌড়ে আসে।

-স্যার, লোকটা এমনই।  আউলা টাইপের।  কারো ক্ষতি করতে পারে নাই কোনদিন।  তার কর্মের দায় সব আমার। তারে চাকরি থেকে বের করে দিয়েন না, আমরা না খেয়ে মরব বলেই মহিলা কাঁদতে শুরু করে।

এমন যখন অবস্থা তখন মজুমদার সাহেব লোকলস্কর নিয়ে একদিন হাজির হলো বড় ভাইয়ার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে।  সেই লোকলস্করের মাথা হচ্ছে নুরে আলম।  আমরা গোপনে জানতে চাইলাম নুরে আলমের ডিমান্ড কি? সে তার রক্ষিতাকে রিসিপশনে দেখতে চায়।  তথাস্তু বলে চলে আসলাম।  নুরে আলম তার বাহিনীকে নিয়ে স্থান ত্যাগ করল।  মজুমদার এবার মাঠে নামল আমাদের বিল্ডিং এর জমির মালিক ও তার ছেলেকে নিয়ে।  চুক্তি ভঙ্গ করেছি, এমন কারন দেখিয়ে সরাসরি উচ্ছেদ নোটিশ।  এখানে সে ভীষণ বুদ্ধির পরিচয় দেয়।

আমরা তখনো এমন কোন নোটিশ পাইনি, অথচ যথাসময়ে উত্তর না দেয়ার কারনে আমরা চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে এরেস্ট ওয়ারেন্ট জারি হল।  সে খবরও আমাদের অজানা।  বিকেল সাড়ে চারটার দিকে দুজন পুলিশ সিভিল পোশাকে এসে জানতে চাইল, আমাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং এর প্রেক্ষিতে হওয়া ওয়ারেন্ট সম্পর্কে কিছু জানি কিনা? আমাদের আসমান থেকে পরার অবস্থা দেখে পুলিশই সাহায্যে এগিয়ে এলো।  বিচলিত না হয়ে পরের ডেটে আমাদের যে কোন একজন প্রতিনিধি পাঠাতে অনুরোধ করল এবং এটাও স্পষ্ট করল যে, তারা কোনভাবেই আমাদের গ্রেফতার করার কথা ভাবেনি।  কোন মামলার কী মোটিভ এবং কী মেরিট পুলিশ তা বুঝে।  আমরা তাদের ধন্যবাদ দিয়ে এগিয়ে দিয়ে এলাম।  আব্বা, আমি আর বড় ভাইয়া বের হলাম আইনজীবীর খোঁজে, আমি আর বড় ভাই বের হলাম ওদের আইনজীবীর খোঁজে।

এ মামলার সমাধান কীভাবে হল, এবং সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘মা-মনি হসপিটাল’কে কখনোই উচ্ছেদ করা যাবে না, এ মর্মে আদালতে রায় হলো।  মজুমদার উচ্চ আদালতে যাবে জানি, আমরা মালিককে খবর দিয়ে কড়া জর্দাসহ কিছু পান আনিয়ে রাখলাম।  জিজ্ঞেস করলাম, মামলায় তোমাদের খরচ হয়েছে কত?

-ষাইট হাজার।  মহিলার উত্তর।

– কুড়ি হাজার।  আমরা বললাম। আমাদের সত্যিই কুড়ি বাইশ হাজারের বেশি খরচ হয়নি।  মহিলা চোখ মুখ লাল করে চলে গেল।  মজুমদারকে তার বাড়ির ত্রিসীমানায় নিষিদ্ধ করে আমাদেরকে খবর দিল যে, আমরা যদি তাকে ষাট হাজার টাকা লোন দেই তবে সে আর কোনদিনই মামলা করবে না।  এই বিষয়ে সে লিখিত দিতে রাজি। বরুড়া বোনের বাড়িতে যাবার সময় বড় ভাইজান মজুমদারকে যে প্রতিশ্রুতি আর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন পরবর্তী শালিশ বৈঠকে মজুমদার আমার কাছে সে জানতে চেয়েছিল, আমি কিছু বলব কি না।  তার দৃঢ় ভরসা ছিল আমি সত্যকে অস্বীকার করার লোক নই।  আমার স্পষ্ট মনে আছে, পাঁচ/ছয় কন্যার জনক দরিদ্র অথচ সর্বদা পরিপাটি এই লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে জিগেস করেছিলেন,

– জাকারিয়া সাহেব, আপনি তো গাড়িতে ছিলেন।  আপনি কি আমাদের কথাবার্তা শুনেছিলেন? শুনেননি বোধ হয়, তাই না ?

কেন জানি আমার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল।  অনেক কষ্টে উত্তর দিলাম,আপনি তো জানেন, আমি সব সময় গাড়ির সামনে বসি।  আপনাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় আমি যদি পারটিসিপেন্ট না হয়ে থাকি, তবে সেসব কথা কি শোনা উচিত? আমি কি সেদিন আপনাদের আলোচনায় যুক্ত ছিলাম? তবে আপনার প্রতি অবিচার হয়েছে, যেমন আপনি আমাদের প্রতি অবিচার করেছেন।  তবুও আপনি নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন।  কিভাবে বলি, আব্বা এবং ভাইয়া তাদের পক্ষের এডভোকেটকে কুড়ি হাজার টাকায় কিনে নিয়েছিল ? আমি তো, সেখানেও উপস্থিত ছিলাম না।  আমার হাতে প্রমাণ নেই।

-জ্বি না।  আপনি সে আলোচনায় অংশ নেননি।  বিনা দ্বিধায় মজুমদার এ সত্য উচ্চারন করে আমাকে, আমিত্বকে এবং আমার সততাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল।  নিজের কাছে নিজেকে একজন চোর, প্রতারক, ভণ্ড আর লম্পট ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না।  সেদিন মজুমদারের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।  ২০১৮ সালে এসে সেই মজুমদারকে খুঁজে বের করে তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে একটা সাক্ষাতকার নিয়েছি।  এখানেও অনেক বিষ্ময়।  এমন সব কথা উঠে এসেছে যা আমি কিছুই জানতাম না।

এসবিসি/জেডসি/এসবি