কালো কোকিল ২

কালো কোকিল ২

শুভ্র রফিক : মজিদ এসেছে বদির সাথে দেখা করতে। এ বাড়িতে মজিদ আগে ঘন ঘন আসতো। কিন্তু বিশেষ একটা কারণে মজিদ ইদানিং তেমন আসে না। বিশেষ কারণ হল রূপা। রূপা তাকে বলেছিল দুই ডজন সবুজ কাঁচের চুড়ি এনে দিতে। সেই সবুজ কাঁচের চুড়ি মজিদ আজও কিনতে পারেনি। এর পেছনে দুটি কারণ। এক নম্বর কারণ হল তার হাত একদম খালি। দুই নম্বর কারণ হল সে অনেক দোকান খুঁজেছে, সবুজ চুড়ি পাওয়া যায় না।

মজিদ পা টিপে টিপে ওয়াল ঘেঁষে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। যেন রূপার সাথে দেখা না হয়। বাংলায় একটা কথা আছে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। মজিদকে এভাবে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে দেখে রূপা বলল, ‘মজিদ ভাই, তোমার কী হয়েছে? পা টিপে টিপে হাঁটতেছ?’
‘কিছু হয়নিরে। তা আছিস কেমন? তোকে তো দেখে শ্যাওড়া গাছের পেতনীর মত লাগছে। শাড়ি পরে বাসায় বসে কেন? কোথাও যাবি নাকি?’
মজিদের মুখে এই কথা শুনে রূপার চোখ ভিজে গেল। লোকটা তাকে দেখলেই এমন সব কথা বলে যে, ইচ্ছে করে মরে যেতে।

‘মজিদ ভাই,’
‘বল।’
‘তুমি আমাকে দেখলেই এমন সব দুঃখজাগানিয়া কথা বল।’
‘তোরে আবার কী বললাম?
‘তুমি মনে করেছ, আমাকে ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাবে। মজিদ ভাই, এটা তুমি কখনও পারবে না। আমাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য পেত্নী বলেছ। আসলে আমি কিন্তু দেখতে তেমন খারাপ না।’
মজিদ বলল, ‘এতই যদি বুঝিস,তাহলে চা, বিস্কুট নিয়ে ছাদে আয়। দুজন চা খাব আর গল্প করব।’
‘আমি তোমার সাথে গল্প করতে পারব না। আমার হাতে সময় নেই বেকারদের সাথে কথা বলার। তুই তো বেশ বড় হয়ে গেছিস এ কদিনে। এত কথা শিখলি কী করে?’
‘কথা কি শুধু তুমিই বলবে? আর সবাই হা করে শুনেই যাবে?’
‘তা বলছিনে। উপরে কি বদি আছে?’
‘গিয়ে দেখো নিজের চোখে। আমি তোমাদের নাস্তা পাঠানোর ব্যবস্থা করি।’

মজিদ গিয়ে দেখে, বদি পা উপরে তুলে মাথা নিচে দিয়ে সেই এক ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে।
‘কিরে, তোর এ অবস্থা কেন?’
বদি কোন কথা বলল না। সে যেভাবে ছিল, সেভাবেই রইল।
মজিদ গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। তার কাজের তাড়া নেই। নাস্তা টাস্তা খেয়ে তবেই যাবে। তবে রূপাকে যেভাবে ক্ষেপিয়েছে, তাতে নাস্তা নাও আসতে পারে।

বদি বলল, ‘নাস্তা ফাস্তা কী খাবি, খেয়ে চলে যা। আমি জীবনকে উপভোগ করার চেষ্টা করছি। তোর কাছে সিগারেট থাকলে ধরিয়ে আমার ঠোঁটে লাগিয়ে দে।’
মজিদ বলল, ‘সিগারেট টানলে তোর লাংসে চাপ পরবে। খুক খুক করে কাশবি। কাশির সাথে রক্ত বের হবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
মজিদের কথায় মনে হয় বদি ভয় পেয়ে গেছে। তরাক করে পা নামিয়ে ফেলল।
‘বলিস কীরে?’
‘সত্য বলছি। এভাবে থাকলে সমস্ত শরীরের রক্ত মাথায় নেমে আসে। তারপর সিগারেট টানলে সমূহ বিপদের সম্বাবনা থেকে যায়।’
মজিদ পরোটা ছিঁড়ে গালে দিল। পরোটার সাথে মুরগির কলিজা ভুনা। টেস্ট খারাপ না।
‘তুই যাচ্ছিস কই?’
‘তোকে দেখতে এলাম।’
‘তুই তো খালি খালি কারো বাসায় যাসনে। কারণ একটা কিছু আছে। সেই কারণটা খুলে বল।’
মজিদ পরোটা খেতে খেতে বলল, ‘নাস্তা সেরে নে তো বলছি।’
রূপা চা করে এনেছে। চায়ের উপর ঘি রঙের সর জমে আছে। মজিদ লক্ষ করেছে, সে যতবার এ বাড়িতে আসে, ততবার তাকে একই কাপে চা দেওয়া হয়। এর মানে কী? নাকি এবাড়িতে অলিখিত কোন বিধান আছে, এক মেহমানের জন্য এক ধরণের কাপ। ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করা দরকার। অবশ্য এখনি যে জিজ্ঞেস করতে হবে, এমন কোন মানে নেই। সময় করে জিজ্ঞেস করলেই হবে।
‘তোর পরোটা তো ফাটাফাটি হয়েছেরে রূপা। খেতে মন চাইছে না।’
‘না খেতে চাইলে খাবে না। পকেটে করে নিয়ে যাও। পথে ঘুরতে ঘুরতে যখন ক্ষিধে পাবে তখন খেয়ে নেবে।’
‘তোর কী হয়েছে বলতো? তুই কি কোন কারণে আমার উপর ক্ষেপে আছিস? ক্ষেপে থাকলে তুই সরাসরি আমাকে বলতে পারিস।’
‘চামচা ধরণের মানুষের উপর আমি রাগি না।’
‘আমি চামচা?’
‘হ্যাঁ। আপনি হলেন তৃতীয় শ্রেণীর চামচা।’
‘বলিস কীরে! আমার সম্পর্কে তোর এমন ধারণা জন্মালো কবে? সত্যি করে বলতো কথাটা কি সত্যি?’
‘ইয়েস। কথা সত্য। তোমার মাঝে আমিত্ব বলে কিছু নেই। তুমি মানুষের সাথে মোসাহেবি করে ফায়দা লোটো। এই যে এখন আমাদের বাড়িতে এসেছ, চামচাগিরি করে সকালের নাস্তা সারতে। তারপর ভাইয়াকে ফুসলিয়ে পকেট থেকে কিছু মাল খসিয়ে নিয়ে কেটে পরবেন।’
মজিদ বলল, ‘নাস্তা করতে আসি এটা ঠিক। কিন্তু বদিকে ফুসলিয়ে টাকা নেব, এটা ঠিক না।’

রাগ মাথায় উঠে যাবার মত কথা। কিন্তু মজিদ অত সহজে রেগে যায় না। প্রয়োজনে রাগ মাটি করে ফেলতেও জানে।‘আমার সম্পর্কে তোর আর কী ধারণা?’

‘আর যে সব ধারণা আছে, তা একদিনে শেষ করতে চাইনে। প্রয়োজনে কাজে লাগাব।’

‘তোর কথা কি শেষ?’

‘না।’

‘তাহলে কথা পেটে না রেখে বলে ফেল। কথা বেশি সময় পেটে পুষে রাখলে পেটে ফেটে যেতে পারে।’

 

রূপা বলল, ‘আমার ধারণা, ভাইয়াকে উদ্ভট উদ্ভট চিন্তাদাতাও তুমি।’

‘আমি আবার কী চিন্তা দিলাম?’

‘অই যে দেখলে না, পা উপরে দিয়ে মাথা নিচুতে দিয়ে থাকা।’

‘সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে আমাকে দোষ দিচ্ছিস কেন? এতদিন শুনেছি উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে, এখন দেখছি উদোর পিণ্ডি মজিদের ঘাড়ে!’

মজিদ পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো। রূপা বলল, ‘প্লিজ মজিদ ভাই, সিগারেট জ্বালাবে না।’‘এটা তো তোর ঘর না। এটা হল বদির ঘর। কাজেই এখানে সিগারেট জ্বালানো যায়।’

রূপা বলল, ‘জানো, সিগারেটের গন্ধে আমার মাথা ঘোরে?’

‘মাথা ঘুরলে তুই অন্যরুমে চলে যা। এটাই আমার লাস্ট ওয়ান। সিগারেট খেয়ে পথে নেমে যাব।’

‘যাবে কই?’

‘নিউমার্কেটের দিকে।’

‘আমিও যাব। ইচ্ছে করলে আমার গাড়িতে যেতে পারো।’

‘তোর যেতে অনেক লেট হবে। মেয়েরা সাজুগুজু না করে ঘর থেকে বের হতে পারে না।’

‘পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো। আমি কাপড়টা পাল্টেই নেমে পড়ব।’

‘তাহলে লেট করছিস ক্যান? চলে যা।’

রূপা চটজলদি শাড়ি পরে, কপালের টিপটা ঠিক করে ঠোঁটে আলতো একটু লিপস্টিক ঘষে নিলো। তার ইচ্ছে, আজ সে মজিদকে একটা দামি শার্ট কিনে দেবে। অকারণেই বেচারাকে অনেকগুলো কথা বলা হয়েছে। এত কথা না বললেও হত। রূপা ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে ছাদে গিয়ে দেখে মজিদ নেই। চলে গেছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল তার। খারাপ মন নিয়ে বাইরে যাওয়া ঠিক না। তার চোখ ছল ছল করে উঠল। কেন মজিদ ভাই তাকে কথায় কথায় আঘাত করে? সে কি দেখতে এতই খারাপ?

ড্রাইভার এসে বলল, ‘আপা গাড়ি রেডি।’

‘গাড়ি গ্যারেজে রাখ।  আমি এখন যাচ্ছিনে.’

সে তার রুমে ঢুকে দরজা এঁটে দিল। এখন সে বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে। দিনে কয়েকবার রূপাকে এভাবে কাঁদতে হয়। কেন কান্না পায়,সেটা সে নিজেই জানে না।

(দ্বিতীয় পর্বের শেষ)

এসবিসি/এসআর/এসবি