শিলালিপি ১২

শিলালিপি ১২

জাকারিয়া চৌধুরী : একেবারে নিষ্পাপ মুখোশ পরা জানোয়ারের মতই সেদিন আমি মজুমদারের সত্যকে সত্যায়ন করিনি। আমার কিছু করারও ছিল না। একটা পরিবারের সারা জীবনের সঞ্চয়, অনিশ্চিত বিনিয়োগ আর খামখেয়ালীর ঝুঁকি নিশ্চিত ছিল বলেই মজুমদারকে ছুঁড়ে ফেলে দেই। এজন্য কখনো কোন রকম অপরাধবোধে ভুগিনি। এটাই আমার করণীয় ছিল। কিন্তু এ থেকে কোন রকম শিক্ষা না নেয়াটা ছিল জীবনের সবচে বড় ভুলের বীজ উর্বর মাটিতে রোপন করা। হসপিটাল সংশ্লিষ্ট সকলেই তার দাবি উড়িয়ে দিয়েছে। বাকি ছিল সে অঞ্চলের সর্দারেরা। শালিশ বৈঠকের সিদ্ধান্ত কী হবে তার ব্লুপ্রিন্ট বানানোর প্রথম কাজটা মজুমদারই শিখিয়ে দিয়েছিল। ফলে নিজের এলাকায় থেকেও নিজের লোকদের কাছে সে যেন পরিত্যক্ত এক এতিমে পরিনত হলো। মজুমদার ফিরে যাবার পর যে চিন্তাটা মাথায় একবারের জন্যেও আসেনি, তা হলো তার অবদানের কথা। আমার বাবা, বড় ভাই, তালই, ভাবী, মেঝো, সেজো ভাই কেউই মজুমদারকে মনে রাখারও প্রয়োজন অনুভব করলাম না।

ভরা পূর্ণিমাতেও চাঁদের অন্য পিঠ ঢাকা থাকে নিকষ কালো আঁধারে। মজুমদারের গুন ছিল মরা গাছেও সে প্রাণ সঞ্চার করতে পারত, আবার তার দোষ ছিল সঞ্চারিত প্রানে ফুলেফেঁপে উঠা গাছকে মেরে ফেলার চেষ্টা। এটা এক প্রকারের অসুখ হতে পারে। লোকটা এখনো বেঁচে আছে। আজ ১২/০৭/১৭ ইং রাত ১১:৫৮ মিনিটে এসে ইচ্ছে হচ্ছে আমি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তার জীবনের গল্প শুনি। আমি নিশ্চিত, তার জীবনের গল্প দরিয়া বিবি’র (জননী-শওকত ওসমান ) জীবনের গল্পের চেয়ে খুব খাটো হবে না। হয়ত তার মানসিক ব্যাধিটাও ধরা পড়বে। (সুজনেরা, একটা খবর শুনে আপনাদের ভালো লাগতে পারে যে, এই লাইনটি লিখার আগেই আমি মজুমদারের সাক্ষাত চেয়ে কোথাও ফোন করেছি। তারপর যোগাযোগ এবং অনুমতিসাপেক্ষে তাঁর সাক্ষাতকার নিয়েছি, যা আগের পর্বেই উল্লেখ করেছি।) আজ আমি একজন পিতা বলেই হয়ত তার মনের ভার কিছুটা হলেও অনুভব করছি। কে জানে, পরপর ছয় মেয়ের অনিশ্চিত জীবন একজন পিতা মজুমদারের বুকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছিল কিনা? নিজের বাড়ি নেই, ঘর নেই, শ্বশুর বাড়িতে পরে থাকা যুগ যুগান্তরের যাতনায় ক্লিষ্ট মানুষ হয়ত এক সময় এমন-ই আত্মঘাতী হয়ে উঠে! এরচে বেশি আর কীই বা আঁচ করা যায়? যে ভুলের বীজ সেদিনের সেই উর্বর মাটিতে রোপণ করেছিলাম, ২০১৭ সালের ১১ই মে সে ভুলের মাশুল দিলাম কি না কে জানে ? আমার ছোট্ট ফ্যামিলিটা সেদিন ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। এ ক্ষতি আমি কাটিয়ে উঠতে পারব না জানি, এর সাথে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না সেও জানি। শিলালিপিও দুই খণ্ডে প্রকাশ পাবে।

শেরপুরের বিলে কুশিয়ারা নদী বিপজ্জনক ভাবে দু’ভাগ হয়ে, নদীর বুকে একটা হিন্দু পল্লীকে জিইয়ে রেখেছে। ঝড়ের রাতে কোন রকম আলো ছাড়া ছোট ছোট নাওয়ে যে মানুষ সে বিল পাড়ি দিয়ে হিন্দুপল্লীটিতে যায়নি, তাকে কখনো এর ভয়াবহতা বোঝানো যাবে না। আমি সংসারবিবাগী মানুষ হয়েও সংসার হারিয়ে আমার পৃথিবী হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার পুড়ে যাওয়া বুক আর কখনো-ই সুস্থ্য হয়ে উঠেনি।

সংসার ধর্মের তুচ্ছ কথাবার্তা আর কলহও বিনা কারণে কখনো কখনো ভয়ংকর দাবানল ছাড়িয়ে জীবন্ত ফুজিয়ামোর রূপ নিতে পারে। তা জীবনে প্রথম এবং সম্ভবত শেষবারের মত অনুভব করি যখন তৃতীয় কেউ এসে চোখের সামনেই সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়। আমার পুরো জীবন যেন ফাটা বাঁশের মত প্রচণ্ড শব্দে চৌচির হয়ে যায়। সেদিনই প্রথম বুঝতে পারি, ঘুমিয়ে থাকা সব মানুষই ঘুমিয়ে থাকে না, জেগে থাকা যে মানুষটার সাথে এতক্ষন খুনসুটি করছিলাম সেও কি অবলীলায় বলে দিতে পারে, আমি কিচ্ছুটি শুনিনি। ঠিক যেমনটা করেছিলাম মজুমদারের শালিশ বিচার নামক প্রহসনে। তার ফল এমনভাবে পেলাম যেন, একই নাটকের বহু মঞ্চায়ন। সকল দৃশ্যেই আমার অদৃশ্য উপস্থিতি, প্রেক্ষাপট শুধু ভিন্ন ভিন্ন। কেউ যেন চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল, পরিণতি দেখো সোনা। তুমি যে কাণ্ড করেছিলে, এখন তাই হবে। তুমি শুধু এর যাতনাটা অনুভব করতে পারবে, কোন কথা বলা যাবে না। নো টক, নেভার ট্রাই টু ফাইন্ড আ ডিফেন্স……… সেদিনের সে আঘাতে যতটা না যাতনার অনুভুতি বোধ করেছি, তারচে হাজার গুন অবাক হয়েছি যখন দেখলাম, কুড়ি বছর ধরে পেলে পুষে বড় করে তোলা পাখিটা দাবি করছে গত ৪০-৪৫ মিনিটের তাণ্ডবলীলার একটা শব্দও সে শোনেনি।

ঢাকা থেকে কুমিল্লায় ফিরছি। একটা লম্বা টাওয়েলে মুখ ঢাকা। বাসে বসে কাঁদতে কাঁদতে লিখলাম, অতপর তিনি বজ্রের নিকট জানতে চাইলেন, এত উচ্চ নিনাদ আর স্ফুলিংগের এমন কি হেতু দেখা দিল যে, শিবের আসন পর্যন্ত গলিয়া গেল? কোন কিছু বুঝিয়া উঠিবার পুর্বেই শিব স্বয়ং ভুতলে পতিত হইল? কার এতবড় সাহস? পার্বতী ? কিন্তু শিব তো বিনায়ককে এখনো খুন করে নাই! নাকি তার স্খলন? নাকি বিশ্বলয়ের যৌথ আক্রমণ ? কিন্তু কেন? এতবড় সর্বনাশের আগে আমি কিচ্ছুটি টের পাইলাম না কেন? ইহা নিছকই কোন দুর্ঘটনা নহে।

এ নিয়ে আমার মনে কোন ক্ষোভ বা খেদের লেশমাত্র নেই। সবাই সব কিছু পারে না। জল্লাদের কাজ যেমন আমাকে দিয়ে হবে না তেমনি শাহজাহান জল্লাদকে আজ ছেড়ে দিয়ে কাল বললেই যে, সে কোন যাত্রীবাহী বিমান কিংবা কার্গো অথবা কোন ফাইটার জেটের চৌকশ পাইলট হয়ে যেতে পারবে তা ভাবার কোন কারন নেই। মজুমদার বিচার কাণ্ডে কি আমার কোন সংশ্লেষ ছিল না? মেঝো ভাইয়ের প্রতি ভয়ংকর অবিচার অনাচারে (পরের পর্বে আসবে) কি আমি বাধা দিয়েছিলাম নাকি উৎফুল্ল হয়েছিলাম? যে কারো প্রতি আমার রাগ-বিরাগ থাকতেই পারে। কিন্তু চোখের সামনে সেদিনের অবিচারে উৎফুল্ল হওয়া কিংবা নিরব সমর্থন দান যে, সামান্য একটা বিড়ালের বাচ্চাকেও ক্ষিপ্র চিতায় পরিনত করতে পারে, সে শিক্ষা তো হাতে কলমেই পেয়েছি। তারও বহু পরে ফ্রানকেন্সটেইন নামক বইটি পড়ি। বইয়ের গল্প আর জীবনের গল্প এক নয়। জীবনের গল্পকে যদি বইয়ের পাতায় সেই সময়, আবহ, চিন্তা, চেতনাসহ কাল্পনিক কোন দৃশ্যায়ন করা যেত, তাতেও সত্যের সামান্যতম অংশের বাস্তব রূপ দেয়া যেত কিনা সে সংশয় আমার আছে। শফিক রেহমানের বাবা (মি. সাইদুর রেহমান) নিজের বাড়ির নাম রেখেছিলেন সংশয়।

আজ মনে হয় বুঝতে পারছি, সংশয় যেন এক চলমান লাভা। আর জীবন্ত লাভাতেই আমার প্রাণসঞ্চারী। নিজে যেমন পুড়ে চলেছি, তেমনি সামনে যা কিছু পড়ছে সব পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এখানে আমার সংশয়, এই পোড়া কপালে, পুড়ে যাবার কাল কি কোন অসীম সময়কে বুঝায়? নাকি পাই (π) এর মত কোন কিছু ? ২২÷৭= ৩.১৪১…………….? অসীম এই যাত্রার কোন শেষ নেই। সম্ভবত সংশয়বাদীদেরও অন্য কিছু ভাবার অবকাশ নেই। বাবার কাছ থেকে বাড়ি করার টাকা প্রায় জোর করে ছিনিয়ে নেয়ায় আমার সমর্থন ছিল ( অবশ্য সমর্থন না দিলেও বড় ভাই নামক এই ঘোড়াকে থামানো যেত না )। ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা, অন্ধত্ব, আনুগত্য, একতা, জাতীয়তাবাদ আমাকে এতটাই একরোখা আর বেপরোয়া করে তুলেছিল যে, সেদিন আমি মজুমদারের চোখের পানি দেখেছি কিন্তু ভাইয়ের হিংস্রতা খেয়াল করিনি। বড় ভাই, যাকে সৎ, সজ্জন আর উদার হিসেবে জানি তার পেছনের মানুষটা কেমন তা জেনে যাবার মোক্ষম সুযোগ প্রথমবারের মত হারাই আমি। তার দিকে অবিশ্বাস আর সন্দেহের দৃষ্টি যদি সে সন্ধ্যায় দিতে পারতাম তবে আমি নির্ঘাত একজন চালাক লোকে পরিণত হতাম এবং ভুল করতাম না। চালাক হয়ে যাওয়াকে আজীবন ঘৃণা করেছি, ভ্রান্তিকে করেছি বরণ। ফলে আমি মহাপাপ যেমন করেছি তেমনি মহাশাস্তিও ভোগ করে চলেছি।

আমার একটা দুঃখ আছে। আমার প্রতিটা পরিণতির উৎস আমি ঠিক ঠিক খুঁজে পাই। শাস্তিও মেনে নেই বিনা বাক্যে।  কিন্তু সমাপ্তি? এর কোন লক্ষণ আমি কখনোই দেখি না। এটাই কি সংশয়? যার এ অসুখে জীবন আটকে যায়, তার মুক্তি নেই। এ এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত যেন………

পাঠক, দুঃখিত। আজকেও শিলালিপির মূল কথা থেকে দূরে দূরে ছিলাম। উপলব্ধিজনিত ব্যথা ব্যক্ত না করে, কীভাবে শিলালিপিকে এগিয়ে নিয়ে যাই? আমি পারি না, অনেক কিছুই পারি না।

এসবিসি/জেডসি/এসবি