কালো কোকিল ৩

কালো কোকিল ৩

শুভ্র রফিক : শান্তিদি গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি দূরের দিকে। চুলগুলো এলোমেলো। মনে হচ্ছে ঘুম থেকে উঠেছেন।

মজিদ বলল,আদাব দিদি।
শান্তিদি মজিদকে দেখে বললেন, মজিদ না?
জ্বি দিদি।
এসো ভেতরে এসো। তারপর ঘেমেটেমে একাকার। ব্যাপার কী বলতো?
ব্যাপার কিছু না। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি তো। তাই ক্লান্ত হয়ে গেছি। জল থাকলে একগ্লাস জল দিন। যত ঠাণ্ডা হবে ততই ভাল।
তুমি ভেতরে এসে বস। তোমার জলের ব্যবস্থা করছি। জল খাবে নাকি তেঁতুলের শরবত খাবে?
জল দিন। আমার পেটে আলসার। তেঁতুল খাওয়া টোটাল মানা।
কী যে বাজে বকো! আলসার আবার কবে হল?
হয়নি। তবে হতে কতক্ষণ?

শান্তিদি জল নিয়ে পাশের সোফায় বসলেন। ফ্যানটা আস্তে আস্তে ঘুরছে। মজিদ বলল,দিদি ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিন। অবস্থা ভয়াবহ।
শান্তিদি ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, এমন গরমে কেউ হেঁটে বেড়ায়? তোমরা কেন যে সব কিছুতেই পাগলামো কর, এটা আমার বুঝে আসে না।

শান্তিদি সম্পর্কে এখানে একটু বলে রাখা আবশ্যক।
একাত্তরে শান্তিদির পরিবারের সবাই পালিয়ে ভারত চলে গেলেন। কিন্তু শান্তিদি গেলেন না। তিনি সবাইকে বললেন,যে দেশের আলো হাওয়ায় মানুষ, সেই দেশের বিপদকালে তাকে ফেলে চলে যাব নিজের প্রাণ বাঁচাতে? এমন স্বার্থপর আমি না। শান্তিদির মা বললেন,ঠিক আছে,তুই যখন দেশকে এতই ভালোবাসিস। তাহলে স্বধীন হোক দেশ,তখন না হয় চলে আসিস।
শান্তিদি বললেন,তোমরা চলে যাও। আমি মরলে এদেশে থেকেই মারা যাব।
কে তোকে দেখাশোনা করবে?
নিজেই নিজেকে দেখব। আমার দেখার জন্য লোকের দরকার নেই।
শেষটায় অনেক বলার পরেও রাজি হল না শান্তিদি। তিনি থেকে গেলেন নিজের বাড়িতেই। গ্রামের অনেকেই তাকে ভয় দেখাল। কিন্তু তাতে কিছুই হল না। সে নিজের বাড়ির মাটি আঁকড়ে পরে রইল। গ্রামের যুবক মতি মিয়া সে এসে পাশে দাঁড়াল। বলল,একদম চিন্তা করবি না। আমি আছি। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে বলবি। কেউ কিছু বললে আমাকে বলবি। মাথা কেটে গাঙ্গে ফেলে দেব।

মতি মিয়া শান্তিদির ক্লাসমেট। একই গ্রামে দুজনের বাড়ি। বিপদে মতি মিয়াই তার পাশে দাঁড়াল। কিন্তু বিধি বাম। একদিন পাকবাহিনী গ্রামে ঢুকে পড়ল। তারা গ্রামের সুন্দরি মেয়েদের সাথে শান্তিদিকেও গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ধরে নিয়ে গেল। মতি মিয়া মাঠে ছিল। বাড়িতে এসে খবর পেয়ে গেল ক্যাম্পে। শান্তিদিকে বাঁচাতে। তখন দেশ স্বাধীনের আর মাত্র চারদিন বাকি। হন্তদন্ত হয়ে মতি মিয়াকে ক্যাম্পে আসতে দেখে সেপাইরা গেইটেই তাকে আটকে ফেলল। মতি মিয়া চেঁচিয়ে বলল,শান্তি কোথায় ওকে ছেড়ে দে।
ক্যাম্পে চেয়ার পেতে বসেছিল জব্বার মিয়া। পরণে ধবধবে পাঞ্জাবি।
আহ মতি মিয়া, এখানে চেঁচিয়ে লাভ নেই। ভাল চাওতো বাড়ি ফিরে যাও। কখনো শুনেছ যে, পাকবাহিনীর হাতে ধরা খেয়ে কেউ রক্ষা পেয়েছে?
মতি মিয়া বলল,শালার পুত। তুই তাইলে পাকদের দলে? আজ তোরে আমি খাব।
এই বলে ঝাঁপিয়ে পরল মতি মিয়া জব্বারের উপর।
পাক সেনাদের ধৈর্য কম। হঠাৎ একটা গুলি এসে লাগল মতি মিয়ার মাথায়। কাত হয়ে পড়ে গেল মতি মিয়া। আর উঠে দাঁড়াতে পারল না। চলে গেল ওপারে।

শান্তিদিকে ছেড়ে দেওয়া হল রাত আটটায়। প্রাণে বেঁচে এলেও শান্তি দির শেষ রক্ষা হল না। মেয়েদের মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে সে ফিরে এলো নিজের ঘরে।
জাতপাত সব ফেলে মতি মিয়াকে শান্তিদি ভালোবেসে ফেলেছিল। সে ঘর বাঁধা আর হয়ে উঠল না। সেই থেকে শান্তিদি চিরকুমারিই রয়ে গেলেন। বিয়ে আর করলেন না।

*****************

সকাল থেকেই রূপা সাজুগুজু করে বসে আছে। মেয়েদের একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে,যখন সে সাজুগুজু করতে পছন্দ করে। রূপার অবশ্য সাজুগুজু করার বিশেষ কারণ আছে। তার মন বলছে, মজিদ আজ আসবে। আসলে মেয়েরা নিজের জন্য সাজে না। সাজটা সে বিশেষ কাউকে দেখানোর জন্যই সাজে। সে সকালে উঠে নিজের হাতে নাস্তা তৈরি করেছে। কয়েকজনকে খাইয়েছে। তাদের মতামত নিয়েছে। কিন্তু দেখা যাবে, মজিদ নাস্তা খেতে বসে বলবে,কী যে রান্না করেছিস রূপা! এ রান্না তো গরুরও অরুচি হবে। কিংবা বলবে আজকে এত সাজুগুজু কেনরে? টিপটা দেওয়ায় তোকে গারোদের মত লাগছে। কেন যে মজিদ ভাই তাকে দেখলেই গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চায়,এটা তার বোধগম্য নয়। অথচ মজিদকে সে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে। সে ভেবে রেখেছে মজিদ এলে তাকে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে মনের কথাটা বলে ফেলবে। সে কারণে সে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছে দুটি। এতে নাকি জড়তা ভাব চলে যায়। সাহস বৃদ্ধি পায়।

**************

বদি ঘুমিয়ে আছে। তার ঘুম ভাঙবে দুপুর দুইটায়। বদির ধারণা, ঘুমের জন্যই মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ ঘুমায় না বলে দেশে এত অশান্তি। মানুষের মন মর্জির ঠিক নেই। দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত দিনে অন্তত দশ ঘন্টা ঘুমানো।
রূপা বলল,ভাইয়া নাস্তা করবি না?
তোরা নাস্তা কর। আমি একটু ঘুমিয়ে নিই। এখন তো বারোটা বাজে।

উঠে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করে আবার ঘুমা।
নাস্তা পরে,আগে ঘুম। এখন তুই রুম থেকে বের হ। আমাকে ঘুমাতে দে।
ভাইয়া, তুই এত ঘুমিয়ে কি লাভ পাস?
আর তোরা না ঘুমিয়ে কী এমন উন্নতি করছিস?.
যা ফুটে পড়। কেউ এলে যেন আমার রুমে না ঢোকে। বলবি বাড়িতে নেই।
আমি মিথ্যে বলতে পারব না।
না পারলে নাই। তুই রুম থেকে বেরিয়ে যা।
রূপা আস্তে করে বের হয়ে গেল। সাজুগুজু করার পর রাগ করা ঠিক হবে না। তাতে ফেসকাটিং এর উপর রাগের ছায়া পড়ে। দেখতে বিশ্রী লাগে।

সে নিজের রুমে গিয়ে ছোট্ট একটা চিঠি লেখল। অনেক সময় ভালোবাসি এই কথাটা মুখে বলতে গেলে লজ্জা লাগে। তাই লিখে রাখলে ভাল হয়। হাতের মুঠোয় পুরে দিয়ে বলা যায়,বাসায় গিয়ে পড়বেন। কিন্তু যার জন্য এতকিছু, সে কি আজ আসবে?

**************

মজিদ বসে আছে জিগাতলার এক চায়ের দোকানে। দোকানীর নাম আরমান। বাড়ি দিনাজপুর। সে মজিদের সাথে খুব ভাব জমাতে চায়। কিন্তু মজিদ তারে পাত্তা দেয় না। তবু লোকটা কেন জানি মজিদকে ভাল পায়। দোকানে গেলে চা,সিঙ্গারা,সিগারেট খাওয়ায়। মাঝে মধ্যে সুখ দুখের কথা বলে।
বুঝছেন ভাইসাব,মর্জিনারে অনেক খরচ পাতি করে বিয়ে করেছিলাম। ভাবছিলাম সুখের সংসার করমু। সে সুখ আর ভাগ্যে জুটলো না। দুধের বাচ্চা ফেইলা চলে গেল ট্রাকের ডাইভারের লগে। এখন টের পাচ্ছে পিরিত কারে কয়!
কেন, সুখে নাই?
আর সুখ। বেটার আগের পক্ষের তিন তিনটা বউ। তাগো লগে ঝগড়া করে আর এক বেলা পাইলে খায়,না পাইলে না খায়। মানুষের সুখে থাকতে ভুতে কিলায়। ওরে কিলাইছে পেত্নিতে।
তোমার সাথে যোগাযোগ আছে?
আমি যোগাযোগ করিনে। হেই মাঝে মধ্যে ফোন করে গায়ে পড়ে।
তুমি কি তারে ঘরে আনতে চাও?
কানে ধইরা তওবা করেছি ভাইজান। আর না। শালি আমার মান ইজ্জত ডুবাইছে। ওরে তুলুম ঘরে?
তোমার মেয়ে কই?
দিনাজপুরে আমার মায়ের কাছে থাকে। বয়স তিন বছর। মাশাল্ললাহ পরীর লাহান চেহারা।
বাড়িতে যাও না?
ঈদের ভেতর যাই। তহন তো ঢাকা শহর ফাঁকা থাকে। লোকজন বেবাক দেশের বাড়ি যায়। আরে, ঢাকা শহরের থানিও মানুষ কয়জন? সবাইতো বাইরের। বাইরের মানুষ না আইলে ঢাকায় কুত্তাও পাইবেন না। তহন বাড়ি যাই। মাইয়াডা আমারে গলা জড়ায়া ধরে বসে থাকে। বড় মায়ার মেয়ে ভাইজান। বিয়ে করেন নাই। তাই বাচ্চাদের মায়া বুঝতে পারেন না। বিয়ে করেন,দেখবেন বাচ্চাগো লাগি কিজাত মায়া জন্মে।
আরফান মিয়া সিগারেট দাও। সাথে একটা পানও দিও। চা খেয়ে মুখটা মিষ্টি হয়ে গেছে।
আরফান মিয়া পান,সিগারেট এনে মজিদ মিয়ার হাতে দেয়।
ভাইজান, একবার দিনাজপুর চলেন মোর লগে। দেখবেন কী সুন্দর আমাগো জেলা।
মজিদ পান গালে দিয়ে বলল,একবার তোমার দিনাজপুরে যাব। ওদিকটায় যাওয়া হয় নাই।
ভাইজান, আপনারা ঢাকার মানুষ কোন জেলায় না গিয়াই সেই জেলার বদনাম করেন। একবার গিয়ে দেখেন।  কত ভাল লাগবে। ধানক্ষেত,টাটকা শাক সবজি। দেখলেই পরান জুড়ায়া যাইব।
আরফান মিয়া কথা দিলাম। সামনের কোন একদিন তোমার দিনাজপুরে গিয়ে দেখে আসব। সাথে আমার বন্ধু বদিকেও নিতে হবে। বদির ধারণা, বেহেশতের পরে যদি ভাল কোন জায়গা থাকে,তাহলে সেটা ঢাকা।
মজিদ মিয়া মুখ গম্ভীর করে বলল,ঢাকা বসবাসের জন্য কোন ভাল জায়গা হল? এখানের বাতাসে শিসা ওড়ে। বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস। সেই গ্যাসে চোখে গেলে চোখ জল চলে আহে।
মজিদ উঠে দাঁড়াল। অনেক সময় এক জায়গায় থাকা তার জন্য উচিত নয়। পথে চলতে চলতে ঠিক করবে কোথায় যাওয়া যেতে পারে।

(তৃতীয় পর্বের শেষ)

এসবিসি/এসআর/এসবি