বঁধু কোন আলো

বঁধু কোন আলো

নাঈমা মৌ, সাংবাদিক, ডিবিসি নিউজ : সকালে অফিসে যাবো। বাসা থেকে বেরিয়ে রিক্সা নিয়ে ১০ নাম্বারে নেমে, খানিকটা পথ হেঁটে ট্রাস্ট পরিবহণের বাস স্টপেজের কাছে গিয়ে ওদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম ‘ মামা কোন বাস আগে যাবে? (ট্রাস্ট পরিবণের বাসের সিরিয়াল থাকে।) তো তিনি হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে দিলেন। এরপর দুই কদম হেঁটে একটু এগিয়েছি, অমনি পেছন থেকে এক ছেলে কণ্ঠ গেয়ে উঠলো ‘ভিগি ভিগি রাত.. ।’ কঠিন চোখে পেছন ফিরে তাকাতেই লাজুক দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে, সেই মহান শিল্পী মাথা নিচু করে ফেললেন। সাথে গলাটাও জি শার্পে নামিয়ে নিলেন। স্পষ্টই বুঝলাম আমার উদ্দেশ্যেই তার এই সংগীত।

প্রচণ্ড গরমে অস্থির আমি, তাকে আর কিছু না বলে বাসে উঠে পড়লাম। দেখি, বাস ভর্তি লোক। আরামদায়ক কোন সিট খালি নাই। শুধু একেবারে সামনে ২টা সিট খালি। মানে ড্রাইভারের বাম পাশে যে দুইটা সিট থাকে ওই দুইটা খালি। কী আর করা! সেই একটা সিটে বসলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসের চালক চলে এলেন তার সিটে। তখনও একদম পেছনের কয়েকটা সিট খালি। তবু ড্রাইভারের উঠে পড়া দেখে আমি একটু অবাকই হই।

অন্যদিন এই পরিবহনের যে কোন বাস সিটিং হয়ে গেলেও, ড্রাইভার সাহেবদের দেখা পেতে ডাকাডাকি করতে হয়। আর আজ! আমি ড্রাইভারের দিকে তাকাই। দেখি, তিনি সেই মহান শিল্পী, যিনি কিছুক্ষণ আগেই আমাকে লক্ষ্য করে, ‘ ভিগি ভিগি রাত’.. গাইছিলেন। আমি ইগনোর করি। অন্য পাশে তাকিয়ে থাকি। বাস আর ছাড়ে না। কারণ সিটিং হয়নি তখনও।  এই সময়টাতে শিল্পী একের পর এক সব রোম্যান্টিক হিন্দী গান গেয়েই চলেছেন। সাথে স্টিয়ারিংটাকে তবলা বানিয়ে আংগুল দিয়ে তালও মেলাচ্ছেন।

আমি অন্য পাশে মুখ ঘুরিয়ে কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না- এমন ভাব নিয়ে বসে থাকলাম। কিন্তু গান তো ঠিকই কানে আসছে। হঠাৎ খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, লোকটার গলাটা কিন্তু অসাধারণ! কঠিন কঠিন সব গান তিনি একদম ঠিকঠাক সুরে গেয়ে চলেছেন।

কিছুক্ষন পরেই বাস ছাড়ল। মিরপুর ১৪ নাম্বার পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই জ্যামে আটকে গেলাম। এদিকে, এক পাশ ফিরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওদিকে আমার ঘাড় ত্যাড়া হয়ে যাবার জোগাড়! তাই এপাশে মুখ ঘোরাতেই ড্রাইভার মশাই সেই লাজুক চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে মুখটা নামিয়ে নিলেন। মুখ নামিয়ে থেমে রইলেন না, আবারও গান ধরলেন। এবারে বাংলা সিনেমার হিট গান।

আমার কেমন যেন লাগলো! মানে, রাগ হওয়ার বদলে একটু হাসিই পেয়ে গেলো তার কাণ্ড দেখে। মুখটা গম্ভীর করে রাখলেও, ভেতরে ভেতরে সত্যিই হেসে ফেললাম।

কিশোরবেলার নানান স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। স্কুলে যাওয়ার সময় এরকম কত গান শুনেছি, রাস্তায় অপেক্ষমান তরুনদের কণ্ঠে! বাসে বসে এই ড্রাইভারের গান, তার লাজুক লাজুক চোখের চাহনী, আর একের পর এক গান শুনছি আর ভাবছি হায়! জীবনের এইবেলা এসেও সেই একই চিত্র!

যাই হোক। জ্যাম ঠেলে বাস এগিয়ে চলে। সৈনিক ক্লাব স্টপেজে আমি নামবো। ঠিক তার আগের সিগনালে বাস আবার আটকে গেলো। লম্বা জ্যাম দেখে লোকজন সব একে একে নামতে শুরু করলো। আমি নামবো কী না ভাবছিলাম।

আর ভাবছিলাম, বাসের চালকের কথা। গানগুলো আমাকে উদ্দেশ্য করে গাইলেও, সে কিন্তু একবারও কোন রকম অসভ্যতা করেনি। এই বিষয়টা আমার ভালো লেগেছে। তাছাড়া এত সুন্দর একটা গলা যে, কোন বাসের ড্রাইভারের হতে পারে, আমি ভাবতেই পারিনি। তাই ওনার চেহারাটা একটু ভালো করে দেখতে ইচ্ছে হলো আমার। তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে, টুপ করে লুকিয়ে দেখে নিলাম শিল্পী ড্রাইভারকে। মুখ ভর্তি খোচাখোঁচা দাঁড়ি, উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রঙ, লম্বা, স্বাস্থ্যবান যুবক। বয়েস ৩৫/৩৬ হবে।

পরে সবার মতো অপেক্ষা না করে আমিও বাস থেকে নেমে যেতে চাই। চালকের দিকে মুখ ফিরিয়ে নামার উদ্যোগ নিতেই, ড্রাইভার সাহেব এবার লজ্জা শরম ভুলে, সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠলেন, ‘বঁধু কোন আলো লাগলো চোখে’..
মনে মনে আমি জাস্ট ভিমড়ি খেলাম। এ কী শুনছি আমি! বাসের ড্রাইভার সে কি না গাইছে রবীন্দ্র সংগীত! এবার আমিই খুব লজ্জা পেলাম!

এদিকে, সিগনাল ছেড়ে দিয়েছে। আমি আবার সিটে বসে পড়লাম। ওইদিকে চালক সাহেব তার বাসের গতি মনে হয় ঘন্টায় ২০ কিলোমিটারে নামিয়ে এনেছিলেন। তাই ৩০ সেকেন্ডের ওইটুকু পথ ৫ /৬ মিনিট লাগিয়ে দিলেন পৌছাতে। এরপর সৈনিক ক্লাব আসে, আমি নামতে নামতে শুনতে পাই, ড্রাইভার গেয়ে চলেছেন, ‘ছিল মন তোমারই প্রতীক্ষা করি, যুগে যুগে দিন রাত্রি ধরি..’

ঢাকা শহরে বাসে চড়ছি প্রায় ১৩ বছর। প্রতিদিনের এই চলাচলে জীবনের যত কুতসিত অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার মধ্যে ড্রাইভার আর তার সহযোগীর ভূমিকা কম নয়।

কিন্তু আজ যেটা হলো, সেটাকে কী বলবো বুঝছি না, আমি সত্যিই বিমোহিত।

এসবিসি/এনএম/এসবি