অনার কিলিং!

অনার কিলিং!

সালেহ বিপ্লব, বিবিসি অবলম্বনে : অম্রুথা কাঁদতেও যেন ভুলে গেছে! চোখের সামনে খুন করা হয়েছে তার স্বামী প্রণয়কে। খুন করিয়েছেন অম্রুথার বাবা মারুতি রাও! তেলেঙ্গানা রাজ্যের ধনী ও উঁচু বর্ণের তিনি। ছেলে নিচু জাতের বলে এ বিয়ে মেনে নেননি ধনী মারুতি রাও, তাই খুন করিয়েছেন। খরচ করেছেন ১ কোটি রুপি। মা ও স্ত্রীর সামনে প্রণয়কে খুন করা হয় গত ১৪ সেপ্টেম্বর।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তেলেঙ্গানার ছোট একটা শহর মিরযলাগুদা। সেখানে বিশাল নাম ডাক রাও পরিবারের। উঁচু জাত। ধনী। প্রভাবশালী। সেই পরিবারের মেয়ে অম্রুথা। তার সাথে প্রণয়ের পরিচয় হাইস্কুলে। স্কুলে পরিচয়ের দিন থেকেই বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব বেড়ে চলে বয়সের সাথে সাথে। গভীর বন্ধুত্ব এবার প্রেমের আগুন জ্বালাল, ওদিকে আগুন লেগে গেল সমাজে! অম্রুথার পরিবার এটা মানতেই পারে না। প্রণয় ছোট জাতের, দলিত সম্প্রদায়। দলিতদের তারা অস্পৃশ্য জানেন। প্রণয়ের সাথে অম্রুথার বিয়ে!!  তাদের সমাজের রীতিতে এটা অসম্ভব। সেই অসম্ভবের লাল চোখকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বিয়ে করে ফেলল প্রণয় আর অম্রুথা। ২০১৬ সালের এপ্রিলে। সংসার শুরু করল, সুখের নতুন বার্তা নিয়ে এলো ২০১৮ সাল। সন্তান আগমনের সুসংবাদ, ৫ মাসের অন্তসত্বা অম্রুথা। এমন সময় ফুঁসে উঠল অম্রুথার সমাজ, যারা ধনী, অভিজাত ও অহংকারী। অম্রুথার বাবা মারুতি রাও পরামর্শ করলেন ভাইর সাথে। ভাড়াটে খুনী দিয়ে মেরে ফেলার প্ল্যান করলেন দুজনে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর।  অম্রুথার পিঠের ব্যথাটা বেড়েছিল। ঘুম থেকে দেরি করে ওঠেন। এরপর স্বামী ও শাশুড়ি তাকে নিয়ে হাসপাতালে যান। চেক আপ শেষ করে বের হয়ে আসেন তিনজনে, স্বামী প্রণয় হাঁটছিলেন স্ত্রীর কয়েক কদম পেছনে। অম্রুথা একটা কথা জিজ্ঞেস করলেন, জবাব নেই।  পিছনে ফিরে তাকাতেই স্বামীকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলেন।

হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পরিবারটি হাসপাতাল থেকে বের হতেই এক লোক তাদের পিছু নেয়। কুড়াল দিয়ে প্রণয়ের পিঠে আঘাত করে , প্রণয় মাটিতে পড়ে গেলে আরও একটি আঘাত। প্রণয়কে বাঁচানো যায়নি, আর এই খুনের জন্য নিজের বাবা মারুতি রাওকে অভিযুক্ত করেছেন অম্রুথা। পুলিশের কাছে নিজের অপরাধ কবুল করেছেন তিনি। মারুতি রাওর সাথে ধরা পড়েছে আরও পাঁচ জন। মারুতির ভাই। আর তিন ভাড়াটে খুনি, যাদের সুপারি কিলার বলা হয়।

জেলার পুলিশ সুপার এ ভি রঙ্গনাথন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘অপরাধ স্বীকার করেছে মারুতি রাও। জবানিতে সে বলেছে, প্রণয় দলিত সম্প্রদায়ের, সে ধনীও নয়। তার সাথে অম্রুথার বিয়ে হতে পারে না। অথচ তারা বিয়ে করে ফেলেছে।  তাই বংশের সম্মান রক্ষায় মেয়ের স্বামীকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এর আগে তিনবার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় মারুতির সুপারি কিলাররা।’

প্রণয় হত্যার প্রতিবাদে মাঠে নেমেছে তার সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের দলিত বলা হয়। বলা হয় অস্পর্শ্য। আর উঁচু জাত নিচু জাতে প্রেম বা বিয়ে নিয়ে ভারতে এমন অনেক ‘অনার কিলিং’ নিয়মিত হয়, বিবিসি তেলেঙ্গানার দীপ্তি বাথিনী তাই জানিয়েছেন। তিনি এও জানান, এই অনার কিলিং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছেন ভারতের মহিলারা। তারা এই বর্বরতার অবসান চান।

বংশের সম্মান রাখার কী বর্বর রীতি! চতুর্থবারে সফল হয়ে জিঘাংসা পূর্ণ করলেন মারুতি রাও। ধরাও পড়লেন। অস্পৃশ্য বলে মেয়েজামাইকে খুন করেছেন কিন্তু কন্যার গর্ভে বেড়ে উঠছে সেই দলিত সম্প্রদায়ের বীজ। এই অনাগত সন্তানকে নিয়ে অম্রুথা নিশ্চয়ই সেই লড়াইয়ে সামিল হবে, যারা জাতের বিভেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন।

এসবিসি/এসবি