প্রথম রাতেই রহস্য

প্রথম রাতেই রহস্য

সালেহ বিপ্লব : বন্ধু, চলো। এই দুই শব্দের বাক্যটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাক্যগুলোর একটি। অনুরোধের সুর হলেও স্বরটা যেন সুস্পষ্ট কমান্ড!  অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। শেষ বিকেলে  ঘাপটি মেরে বসে ছিলাম নিজের আস্তানায়। আসলাম আর দিদার এসে হাজির। এসেই বলে, বন্ধু চলো। বন্ধুর কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা খুব কম মানুষের থাকে। আমি পারি না। আসলাম তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবে আমাকে, দিদার সে বাড়িতে এসেছে দু’দিন আগেই। সন্ধ্যায় দূরে কোথাও রওয়ানা হতে আমার আসলে ভালো লাগে না। তবে আসলামের গ্রামের বাড়ি মানে দূরের কোন ব্যাপার না। মতিঝিল থেকে মোটরবাইকে ২৫ মিনিট লাগে। জেলা নারায়ণগঞ্জ, থানা সোনারগাঁও, গ্রামের নাম পেরাবো। শীতলক্ষা পার হয়ে বামের রাস্তা, ভুলতা মোড় থেকে ডানে যেতে হয়।

সেদিন বৃহস্পতিবার। বাসে যাত্রীর চাপ বেশি। সিটিং সার্ভিস মিনিবাস। অনেক লম্বা লাইন ধরে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে। আসলাম চেষ্টা করল সিএনজি নিয়ে যাবার, আমি একেবারেই রাজি ছিলাম না তাতে। তবুও সে চেষ্টা করল। একে তো মেহমান, তার ওপর আমি! দুই যুগের বন্ধুত্ব, অথচ দেখা হল অনেক বছর পর। বাসে কষ্ট হবে ভেবে সে সিএনজি ঠিক করতে গেল। বৃহস্পতিবার দিন। রাস্তায় বাসের সংখ্যা অনেক কম। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের অর্জন এটা, আনফিট গাড়ি রাস্তায় নামে না। এমন অবস্থায় সিএনজির ভাড়া চেয়ে বসছে কেউ চার গুণ, কেউ তিনগুণ। হঠাৎ করেই ডেমরার বাস পেয়ে গেলাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম স্টাফ কোয়ার্টার। সেখান থেকে টেম্পোতে ভুলতা। ভুলতা থেকে ব্যাটারি অটোতে একদম বাড়ির সামনে। বাড়ি বলতে খামারবাড়ি। আমি পথে পথে ঘুরে বেড়াই, এই জেলা থেকে ওই জেলা, আসলাম জানে। তাই থাকার ব্যবস্থা করেছে একটা খামার বাড়িতে। আমাদের অনেক কথা, অনেক আলাপ। এমন নিরিবিলি পরিবেশই দরকার ছিল।

তিন বন্ধু এক সাথে হয়েছি অনেক বছর পর। দিদারের সাথে কদিন আগে চাঁদপুরে দেখা হয়েছে যদিও, তবে তিনজনের এক হওয়া অনেক অনেক সময়ের ব্যবধানে। আমাদের বন্ধুত্বের জন্ম চান্দিনায়। কুমিল্লার চান্দিনা। চান্দিনার চান্দিয়ারা গ্রামে আমার বাল্যবন্ধু জুয়েলদের বাড়ি। কানন, জুয়েল, বাবলু-আমাদের সবার বেড়ে ওঠা আমবাগান রেলওয়ে কলোনিতে। জুয়েলের সাথে চান্দিনা যেতাম, বিশেষ করে আমি আর কানন যেতাম প্রায় নিয়মিত। সেখানে গিয়ে দিদারের সাথে পরিচয়, এরপর আসলামের সাথে। আরও এক বন্ধু ছিল চান্দিনায়, মহিউদ্দীন। জুয়েলের কাজিন সে। বন্ধুর ভাই বলে শুধু নয়, মহিউদ্দীনের সাথে আমার হৃদ্যতা বাড়ে সিটি কলেজে। সেও ছাত্রলীগ করত, কলেজ ছাত্রলীগের পদেও ছিল। খামারবাড়িতে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বসার পর প্রথমেই জুয়েল আর মহিউদ্দীনের কথা চলে এলো। আসারই কথা। দুজনেই আল্লাহর কাছে চলে গেছে, আমাদের পাঁচজনের আড্ডার দুজন নেই। স্মৃতিচারণ করতে করতে মনটা একটু হালকা হল। এর মধ্যে আসলামের বাহিনী আমাদের আপ্যায়নের যাবতীয় আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তালের রস আনা হয়েছে। চুমুক দিয়ে প্রাণটা ভরে গেল, তীব্র মিষ্টি স্বাদে শরীর তো জুড়াল অবশ্যই। নাস্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম রাতের খাবার এগারোটার আগে না।  আমরা এখন আলো নিবিয়ে বারান্দায় বসব। প্রকৃতি দেখব, কথা বলব, ঝাঁপি খুলব অনেক স্মৃতির। দশ বিঘা জমির ওপর খামারবাড়ি। জলাভূমি বিঘা তিনেক হবে, বাকিটায় ফসল, ফলফলাদি চাষ হয়। একটা ছোট্ট বাংলো, খুব সুন্দর। আমরা সামনের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলাম। আমাদের সাথে বাদল আছে, এখানে এসেই পরিচয় ওর সাথে। এই বন্ধুটা খুব সেবা করেছে আমাদের। আরও আছে মানিক। খামারবাড়িটা দেখাশোনার ভার তার ওপর। পারিবারিক একটা আবহ ধরে রাখা হয়েছে, সে কারণে মেহমান আনা হয় খুব কম। একদম কাছের কেউ না হলে আসলাম এই খামারবাড়িতে কাউকে নেয় না। আসলাম মাঝে  মাঝে যায়, মাঝে মাঝে দিদার আসে। দুলাভাই আসেন। তো খামারবাড়িতে মেহমান গেলে মেহমানদের খাওয়া-দাওয়া’র দায়িত্ব নেন আসলামের আপা। মানিক গিয়ে খাবার নিয়ে আসে, আবার খাবার শেষে টিফিন বাটি,  হটপট এবং আরসব আপার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আসে। আসলাম খামারবাড়ি গেলে ইসমাইল আসে, ঘনিষ্ঠ আরও দুএকজন আসে। তারা আন্তরিকভাবেই মেহমানদের দেখাশোনা করে। আমরা এই গ্রুপটাই বসে আছি বারান্দায়।

সব লাইট নেভানো। এসে পৌঁছেছি সন্ধ্যার পর, কিছুই দেখতে পারিনি। এখনো যে দেখতে পাচ্ছি বলা তা যাবে না, তবে আস্তে আস্তে চোখে অন্ধকার সয়ে আসছে। আকাশ মেঘে ঢাকা, একটা দুটো তারা দেখা যাচ্ছে। বাতাস নেই। একটি গাছের পাতাও নড়ছে না। অন্ধকারের নিজস্ব একটা আলো থাকে, সে আলোতে আমি সামনের আঙ্গিনার গাছগুলো চেনার কসরত করছি। কয়েকটা ঝোপজাতীয় গাছ আছে পেঁপে গাছের ফাঁকে ফাঁকে। কিছুতেই চিনতে পারলাম না ওই আলোয়। জিজ্ঞেস করতেই আসলাম জানালো, লিচু গাছ। শুবে আমার তো ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা!  লিচু গাছ এমন হয়! তখন জানা গেলো, এটা চায়না থ্রি লিচু। হাইব্রিড। এটাও অনেক বড় হবে, তবে এই পাঁচ ফুট সাইজ থেকেই ফল দেয়া শুরু করেছে। এই খামারে পেঁপে, কলা, নারিকেল, জাম্বুরা, আম, পেয়ারা, বড়ই এবং কমন আর সব গাছই আছে। কিছু অংশে সবজি চাষ হয়। ধুন্দুলের মাচা দেখলাম পশ্চিমের গ্রীল দিয়ে। ফসল তোলা হয়ে গেছে, মাচায় জড়িয়ে আছে শুকিয়ে যাওয়া লতাপাতা। আর বীজের জন্য রেখে দেয়া কিছু ধুন্দুল দেখা গেল আবছা আলোয়। কৃষি নিয়ে আমার আগ্রহ দেখে একটু ক্লারিফাই করল আসলাম। আসলে এখানে ফুলস্কেল চাষাবাদ হয় না। ফ্যামিলির একটা বেড়ানোর জায়গা হিসেবে এটা গড়ে তোলা হয়েছে। কিছু জায়গা এখনো ফাঁকা, সেখানে আবাদ হবে পরে। রাজধানীর এত কাছে এত নিবিড় গ্রাম! দিনের আলোয় কেমন সবুজ লাগবে, সেটা ভেবে বেশ ভালো লাগছে আমার।

আমাদের সামনে খামারবাড়ির সামনের সীমানার পর সড়ক। মাঝে মাঝে এক দুইটা গাড়ির আলো দেখা যায়। মোটর সাইকেল, অটো কিংবা ট্রাক্টর। দিদার বলল, এই গাড়ির শব্দ মনে করিয়ে দেয়, আমরা নগর সভ্যতার কাছেই আছি। ভেবে দেখলাম, কথাটা মন্দ বলেনি! গাড়ি না গেলে এই বারান্দা থেকে আর কোন লাইট দেখা যায় না। মেঘলা আকাশ থেকে হাতে গোনা তারাগুলোও উধাও। পাখির ডাক, বাদুরের ছুটোছুটি আর শিয়ালের ডাক। কুয়াশা আছে আকাশে, মন দিয়ে শুনলে টুপটাপ শব্দ কানে আসে। গ্রীলের বাইরে যে গাছপালার বিস্তার, সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আঁধার ঘন হয়ে আছে। শহুরে মানুষের চোখে বিভ্রম সৃষ্টি করে এই আলো-আঁধার। কলাপাতার খসখস শব্দ কিংবা পেঁচার ডাক আচমকাই বুকের ভেতর শিরশির ভাব জাগায়। এই অন্ধকার বাগানে শেয়ালের চোখ জ্বলে উঠলে আমাদের মত শহুরে বাবুরা ভিরমি খাবেন, নিশ্চিত।  শেয়ালের ডাক দুবার শুনেছি, বেশ দূর থেকে এসেছে শব্দ। জানা গেল, একটু পর এখানেও আসবে শেয়ালের দল। মানুষজন খুব একটা থাকে না এখানে, থাকলেও আলো জ্বলে না। বাংলোর সামনের দরজা পর্যন্ত শেয়াল আসতে দেখা যায়, জানালেন মানিক আর ইসমাইল। আমার আগ্রহ দেখে আসলাম বলল, অপেক্ষা কর বন্ধু। দেখতে পাবে। আমরা ভাত খেয়ে আবার এসে বসব।বারান্দার বাতি নেভানোর আগে এক সুযোগে সেলফি তুলে ফেলেছি দুজনে। দিদার আর বাদলকে সে সুযোগ না দিয়েই বাতি নিভিয়ে দেয়া হল।

খেতে বসলাম। সে কী খাওয়ারে বাবা! বাহুল্য নেই, যত্ন আছে। ভাব নেই, তৃপ্তি আছে। জীবনে আরও একবার টের পেলাম, ভাইবোনের সম্পর্কটা কোন সুতোয় বাঁধা থাকে। ভাইয়ের বন্ধু এসেছে। নিজের হাতে রান্না করেছেন তার আপা, যে পরিবারে শুধু রান্নাঘরেই দুচারজন সাহায্যকারী থাকে, সেই পরিবারের বউ তিনি। ভাইকে এত এত ভালোবাসেন, ভাইয়ের মুখ উজ্জ্বল করতে অদেখা আরেকটি ভাইয়ের জন্য নিজের হাতে চমৎকার খাবার তৈরি করলেন। তৃপ্তি ভরে খেলাম, পূর্ব ও উত্তর বারান্দায় কিছুক্ষণ পায়চারি করে সবাই আবার বসলাম দখিনের বারান্দায়। শেয়ালের পাল কোন দিক দিয়ে আসে, কড়া নজর রাখলাম আমি। অনেক বছর এই প্রাণীটাকে দেখিনি, তাও এমন পরিবেশে। আমার গলায় রবীন্দ্র সঙ্গীত ভালো হয়, ঘোষণা দিয়েছে আসলাম।  গান শুরু হল। আস্তে আস্তে গলার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সচেষ্ট আমি। রেওয়াজ করা হয় না, তাই চট করে যে কোন স্কেলে যাবার রিস্ক নিতে পারি না। তিন চারটা সুরেলা পরিবেশন ধীর লয়ে, টের পেলাম, গলা জেগেছে। এবার  খুব দরদ দিয়ে একটা বিচ্ছেদ গান করলাম। গান শেষ। আমার দৃষ্টি দূর আকাশে, বাকিরা আমার দিকে চেয়ে। এমনই একটা গান, যেটার কথা আর সুরে মানুষের মন গলে যায়। এই আঁধার রাতে গ্রামীণ পরিবেশ গানটাকে যেন অপার্থিব কোন লয়ে টেনে নিয়েছিল। শ্রোতাদের এমন মুগ্ধতা শিল্পীকে অভিভূত করে। ১০ সেকেন্ডের মত সবাই নিশ্চুপ। বাইরে প্রকৃতিও নিশ্চুপ। আচমকা রাতের নীরবতা চুরমার করে দিল কেউ একজন! আমাদের মাথার উপর কী এক প্রলয় শুরু হল!

একটা মানুষ দাবড়ে বেড়াচ্ছে টিনের চালের এমাথা ওমাথা! তার ওজন আর গতির হিসেবে এতক্ষণে বাংলোর চাল ভেঙ্গে সে পড়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু উপরে চেয়ে দেখলাম মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে, চালের একটি অংশও কাঁপছে না। যেখানটায় ধুম করে পা ফেলল না দেখা প্রাণীটা, টিনের সেখানে আলো ধরে রেখেও কোন কম্পন বুঝলাম না। এটা কী? কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না। এরপর দিদার, যে আমার মতই বহিরাগত, জানালো এখানে অনেক বড় ইঁদুর আছে। আর কেউ কিছু বলল

না। আসলাম একটু আনমনেই বলল, মানিক, ঘটনা কী? মেহমান আসছে বলে আজ আগেই এসে গেল? আরও মিনিটখানেক টিনের চালের এমাথা ওমাথা ভেঙ্গে ফেলার মত আওয়াজ শুনলাম আমরা। আমার ক্রমাগত যুক্তি আর প্রশ্ন শুনে এক সময় একটু যেন বিরক্ত হল ইসমাইল। বিনয়ের সাথে কিন্তু গলা খাটো করে বলল, অনেক কিছু ঘটে দুনিয়াতে। রাতের বেলা সব জিজ্ঞেস করতে নেই। আসলাম মানিককে ডেকে জিজ্ঞেস করল, মুরগীর হাড়গুলো ওখানে রেখে এসেছ তো? মানিক জানাল, সেটা করা হয়েছে। অন্ধকার বলে কেউ কারো চেহারা স্পষ্ট দেখছি না। আমি যে তুমুল ভাবনায় মগ্ন, টের পায়নি কেউ। গ্রামে ঘরের চালে হাঁটাচলা নিয়ে অনেক ভয়ধরানো গল্প আছে। কিন্তু স্পেসিফিক এই বিষয়টা নিয়ে আমি বেশ গবেষণা করেছি। গাছপালা ভরা অঞ্চলে যে সব প্রাণী এই ভয়ধরানো কাজটি করে, সেসব প্রাণীর প্রায় সবগুলোর সম্পর্কে আমার জানা আছে। একটু আগে টিনের চালে যে হেঁটে বেড়ালো, বিজ্ঞানের হিসেবে সেটি একজন মানুষ বা বানর বা এই আকৃতির আর কোন প্রাণী।

আমরা শেয়ালের অপেক্ষায় বসে আছি, শেয়াল আগেরবারের চেয়ে একটু কাছে একদফা কোরাস গাইল। শাহ সাহেব, মানে আসলাম, আমার বিষয়টা বুঝতে পারল। ঘুমানো দরকার, কথাটা বলতেই আর সবাই সাপোর্ট দিল। আমরা শুয়ে পড়লাম। একে একে সবাই ঘুম, গভীর শ্বাসের শব্দ পাচ্ছি সবার। আমার চোখে ঘুম নেই। শেয়াল তাদের নিয়মমত ডাকছে, আমাদের খামারে আসেনি এখনো। মোবাইলে সময় দেখলাম তখন সাড়ে তিনটা। চোখ লেগে আসছে বুঝতে পারছি। আমিও সানন্দে ঘুমের নিমন্ত্রণ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। আচমকা বাংলোটা যেনে কেঁপে উঠল। টিনের চালে দপ দপ করে হাঁটছে কেউ একজন। বিজ্ঞান ও যুক্তিতে বলে, দুপেয়ে কোন প্রাণী, গায়েগতরে বেশ বড়।  আমি কাউকে ডাকার তাগিদ বোধ করলাম না। প্রাণীটা থপ থপ করে হাঁটছে। আমি শুনছি।

প্রথম পর্বের শেষ  

এসবিসি/এসবি