রক্ত ঘামে গড়ে তোলা স্বপ্নমহল

রক্ত ঘামে গড়ে তোলা স্বপ্নমহল

জাকারিয়া চৌধুরী : এতসবের পরেও মজুমদারকে আরও কয়েকমাস রাখি।  মুক্তির স্বাদ আর অচেনার আনন্দ যার চিত্তে বিরাজ করে, নিয়তি যেন তাকে চক্কর কাটা পাখিতে পরিনত করে।  হালকা পাতলা গড়নের যুবক টাইপ চেহারা, চিরাচরিত স্টাইল আর কথা বলার যাদুকরী মন্ত্র যার মনে স্থায়ী হয়ে যায়, আল্লাহ সম্ভবত তাকে সেভাবেই দেখতে চায়। মজুমদার যদি কোন হোটেলে চা খেতে ঢুকে, তার কিছুক্ষনের মধ্যেই সে হোটেলের মধ্যমনি হয়ে উঠে।  ডানে বামে, সামনে পেছনে থাকা যে কেউ-ই মজুমদারের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য।  যে জীবনে শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সে জীবনে মজুমদার টিকে থাকবে; আমার অন্তত সে বিশ্বাস নেই।  তাকে যতভাবে নম্রতা প্রদর্শন করি ততই যেন সে ক্ষিপ্ত, ক্ষীপ্র, ক্ষিপ্ততর হয়ে উঠে।  সন্ধ্যে ঘনাবার আগেই কোন না কোন কারনে এক দংগল লোক এখানে জড়ো হয়। সে মোটামুটি নেতার মত ভাষন দেয়, কাটাবিল সংরাইশের মুর্খের দল হা করে তাকিয়ে থাকে।  তার নতুন দাবি হচ্ছে স্যালারি এবং স্ট্যাটাস নির্ধারন।  সে বড় ভাইকে ছাড়া আর কাউকে স্যার বলে সম্বোধন করবে না।  আট হাজার টাকায় তার পোষায় না।  তখন একজন সরকারী ডাক্তার স্যালারি ড্র করে ৬২০০ টাকা মাত্র।  এই দাবির প্রেক্ষিতে কোন রকম আলাপ আলোচনা পর্যালোচনা ছাড়াই আমি বলে দিলাম- আমাদের কাউকে স্যার বলার দরকার নেই।  আপনি যেভাবে ভাল বোধ করেন সেভাবেই থাকুন।  আর স্যালারি নিয়ে ভাইয়ার সাথে রাতে কথা বলুন, আমি থাকব এবং চেষ্টা করব আপনার দাবির পক্ষে থাকতে।  উল্লেখ্য, তখন স্টাফ স্যালারি দিতাম ভাইয়া, আব্বা স্যালারি পাওয়ার পর।  সারামাস জুড়েই চলত স্যালারি দেয়ার কাজ।  তার কিছু কিছু ইগোয়েস্টিক আচরন সত্যিই অদ্ভুত ছিল।  যেমন আব্বা হচ্ছে হসপিটালের চেয়ারম্যান।  সে আব্বার সাথে এবং সামনে সিগারেট খায়, ভাইয়ার সামনে খায় না, আমার সামনে পারতপক্ষে খেতে চায় না।  আমাকে শুরু থেকেই এড়িয়ে চলার একটা প্রচেষ্টা তার ছিল।  সে জানত যে, আব্বা হসপিটালের চেয়ারম্যান এবং আমরা বাকি চার ভাই সম মালিকানার ভিত্তিতেই হসপিটালের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে।  তারপরেও আমাকে একটা অদ্ভুত রহস্যময় আধার যেন ঘিরে রাখত সব সময়।  সব সময় মনে পীড়া দিত এই ভেবে যে, কোথাও না কোথাও ত্রুটি হচ্ছে।  একটা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছে করেই যেন তার ক্ষতগুলো সারাচ্ছে না।  আমরা সারামাস ঘানি টানছি, অথচ এ বিষয় গুলোকে নিয়ম মাফিক চালালেই হল।  নিয়ম মত চললেই সব স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে।  এত অভাব, অভিযোগ, বিশৃঙ্খলা,কষ্ট, মানসিক চাপ, টার্গেট ফিল আপের টেনশন কোনটাই নির্দিষ্ট একজনকে পিষে ফেলতে পারে না।  এত চাপ সইবার বয়স এবং মানসিক শক্তি আমার নেই।  বৃহস্পতিবার সকালে ভাইয়া অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয় আর ফিরে আসে রোববার অফিস শেষে বিকেলে।  এই পুরোটা সময় ডিউটি ডাক্তারকে সাথে নিয়ে হসপিটাল, সংসার একা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া দুস্কর।  আমাকে দীর্ঘদিন এ কাজ করতে হয়েছে।  ধার দেনা করে করে হয়রান হয়ে গেছি প্রতিষ্ঠান নামক এই যাদুকরী খাদক মেশিনটিকে চালিয়ে যেতে।

যে বিষয় গুলো আমাকে ভারী বিরক্ত করত সেটা হচ্ছে অনিয়ম।  সকাল আটটা থেকে অফিস শুরু।  দশটার আগে কেউ আসেনা।  এ নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই।  আমি নিয়মমত ৭:৫০ এ অফিসে এসে একটা চেয়ার পেতে অফিসের গেটে বসতে শুরু করলাম হাতে একটা কলম আর নোট বুক নিয়ে।  এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান হল।  রাতে বাসায় ফেরার সময় নিউ মার্কেটে নেমে এক গাদা বিলাসী পন্য ক্রয় করার নিত্য অভ্যাস আছে ভাইয়ার ,সেও প্রতিদিন।  যে পরিবারে দেনার দায় প্রতিসেকেন্ড, মিলিসেকেন্ড কিংবা প্রতি পল আর অনুপলে বেড়েই চলেছে সেখানে এইসব নিত্য অপব্যায় আমাকে নিজের কাছেই নিজেকে ছোট করে দিত।  কফি, ক্রিম, মাখন, থেকে শুরু করে নদীর জালে ধরা পরা পাংগাস, লাল রুই, কালো বোয়াল কেনা …… আমি মোটেও পছন্দ করতাম না উলটো সতর্ক করে দিতাম।  ঋনগ্রস্থের জমিদারী মনোভাব আমায় লজ্জিত করে।  শরৎচন্দ্রের বইয়ে দেখেছি- শাস্ত্রে আছে, ধার করে হলেও ঘি খাও।  ধার করা ঘি খাওয়ার রুচি আমার কখনো হয়নি।

দুই বছর আগেও কচুঘেঁচু, পচা মলা মাছ, রেশনের পচা পোকায় খাওয়া চাল আর ঘাস জাতীয় খাবার সেদ্ধ করে খাওয়া মানুষ আমি।  এসব আমার সয় না।  আমি জানতাম, প্রতিশ্রুতি হচ্ছে নিজের আত্মাকে কারো নিকট গচ্ছিত রাখা এবং যতক্ষন একে ফেরত না আনা যাচ্ছে ততক্ষনই আমার অস্বস্তি যেত না।  প্রতিশ্রুতি যে আজকের দিনে প্রতারনা তা বুঝতে এবং প্রমান পেতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পার হয়ে গেল।  বিশ্বাস করে সব কিছু মেনে নেয়া, জমা দেয়া, গচ্ছিত রেখে দুঃশ্চিন্তা করার কোন অভিজ্ঞতা আমার ছিল না।  ফলে বিশ্বাস করার প্রবনতা যে সমাজকে দুর্বলতার মেসেজ দেয় সেও জানা ছিল না।  আর দুর্বল মানুষ মানেই আনফিট ফর সারভাইভাল’ প্রমানিত।  আমাদের সমাজে সততা, সরলতা আর বিশ্বাস হচ্ছে খুন করার বা খুন হবার তিনটা পরিক্ষিত পদ্ধতি।  খুনের এ লীলায় যে জিতে যায় সে-ই সম্মানিত।

একবার একটা নাটকে দেখেছিলাম, স্ত্রী স্বামীর গলা দুহাতে পেঁচিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করছে : আচ্ছা, আমাদের যদি ছাড়াছাড়ি হয়, আমার ব্যাংক লোন কে শোধ করবে গো ?

স্বামী খুব স্বাভাবিক গলাতেই বলল- এখন যে শোধ করছে, সেই সব সময় করবে এবং করেই যাবে অবস্থা যাই হোক না কেন….

স্বামী বেটা জানত না যে, তালাকনামায় সই করার আগে স্ত্রী হোম ওয়ার্ক করছে।  ছেলেটি ভালোবেসেছিল মেয়েটিকে অন্যদিকে মেয়েটি ভালোবেসেছে ছেলেটির সম্ভাবনাকে।  সম্ভাবনা আর সম্পত্তিও যে কখনো কখনো ফলার ফাসে পরিনত হতে পারে, সেই সব সত্য তথ্যের দলিলই কি আমাদের শিলালিপি ? নাকি শিলালিপি হচ্ছে একটা পরিবার কেন্দ্রিক জীবন ব্যাবস্থার ক্রম পরিবর্তন জনিত চেহারা ? নাকি শিলালিপি কোন অভিশপ্ত জীবনের ধারা বর্ননা ?

প্রিয় পাঠক, এসবের উত্তর দেবেন আপনারাই যখন উত্তর দেয়ার সময় হবে।  একটা হসপিটালের ফোন থাকবে রিসিপশনে অথচ থাকছে এমডি রুমে এবং ক্রমাগত বাজবে, এই ফোন ভাইয়াই রিসিভ করবে, কত রকম এবং কত প্রকরনের ফোন যে আসে তার কোন আগা মাথা নেই।  কত রংগের লোক আসে শুধু ফোন করতে তারও আগামাথা নেই।  দেখা গেল, জরুরী কোন বিষয় নিয়ে মিটিংয়ে বসেছি, এ সময়ে তিনবারে তিনটা কল এলো, তিনজন তিনবারে প্রস্রাব করতে গেল, মাঝখানে একবার লিকার চা এবং একবার নাস্তা সহ চা খাওয়া হল, এই ফাকে ম্যানেজার তিনবারে তিনটা ভাউচারে সই করিয়ে নিল, এক ফাকে মজুমদার এসে জানতে চাইল এই হসপিটালে তার কাজ কি ? চিফ এডমিন হিসেবে রুম দুরে থাকুক, তার জন্য কোন চেয়ারের ব্যাবস্থা করা হয়েছে কিনা ? হসপিটাল স্টাফেরা কার নিয়ন্ত্রনে চলবে ? এখানে যে হারে হরিলুট পর্ব চালু হচ্ছে তাতে সে কোন ভবিষ্যত দেখছে না…. এই যে, এতক্ষন ধরে এসে একাই এত কিছু বলল তার প্রেক্ষিতে আমাদের কেউ কোন মন্তব্য করা দুরে থাকুক- ভদ্রতা করেও মজুমদারকে কেন বসতে বলা হল না ? হসপিটাল সংক্রান্ত মিটিংয়ে কেন তাকে নোটিশ করা হল না…………. দ্যা ওয়ার্ল্ড ইজ……. বলতে বলতে মজুমদার নিচে নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।  আমি অন্ধকার দেখতে লাগলাম।  আমাদের কোন মিটিং হচ্ছে না।  সামান্য একটা টিএন্ডটি ফোন রিসিপশনে পাঠানো যাচ্ছে না।  ভাইয়া কারো কথা-ই শুনছে না।  সবচে বড় কথা হল, একটা প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক কোন ডেকোরামের চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।  আমি হাজার বলে কয়েও কিছু করাতে পারছি না।

মিটিং চলাকালীন সময়েই রিক্সাওয়ালা আকছির মিয়া জরুরী খবর নিয়া আসছে।  খবর হচ্ছে – হসপিটাল থেকে বের হয়েই মজুমদার নুরে আলমের ঘরে গিয়া ঢুকছে।  আকছির রাত বারোটার আগে জ্ঞান হারায় না।  দুই নয়নে সে যা দেখছে তাই জানাইয়া গেল আমাদের ওয়েল উইশার হিসেবে।  আকসিরকে বিশ টাকা দিয়ে বিদেয় করা হল রাত সাড়ে ন’টায়।  এখনও যদি বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি তবু বাসায় গিয়ে পৌছব রাত এগারোটায়। আজকের মিটিংয়ের এজেন্ডা কি তাই জানা হল না… আলোচনা তো বহু দুর কি বাত।  তবে আশার কথা হচ্ছে বাবু ( উপর থেকে চতুর্থ সিবলিংস ) ফাইনাল প্রফে পাশ করছে।  এখন সে যদি কুমিল্লায় এসে ইন্টার্নী করে এবং ফাঁকেফাঁকে এখানে নিজের হসপিটালে ডিউটি করে তাহলে ভাইয়ার উপর একটু চাপ কমে।  সে কুমিল্লায় ইন্টার্র্নি করবে কি না, এ জাতীয় রুলস আছে কি না, বাবুর নিজ পছন্দ কি সব কিছু মিলিয়েই চুজ করতে হবে বেস্ট অপশন।  আব্বা জরুরী অবস্থায় হয় চুপ থাকে নতুবা সম্রাট নিরো, সিজারের সেনাপতি মার্ক এন্টনি’র গল্প জুড়ে দেয়।  পরবর্তীতে কোন সিদ্ধান্ত ভুল হলে এর কোন দায়ভার বহন করে না।  একে তাকে দোষারোপ করে এক ধরনের বিরল আত্মতৃপ্তিতে ভোগে।  একবারের জন্যেও ভেবে দেখেনা , যাকে দোষারোপ করা হলো সে তারই আপন সহোদর/স্ত্রী/ কন্যা কিংবা নিজ পুত্র সন্তান।  আমি এমন আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর মানুষ জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি।  কেউ কেউ ভাবতে পারেন, সবাইকেই দোষী করার প্রবনতা আমার আছে।  হ্যাঁ আছে।  গত পর্বে আমি আমার নিজের অসততাকে গোপন করার কোন চেষ্টা করিনি।  শিলালিপি থাকুক নির্মোহ, পক্ষপাতহীন।  একে আমি এ্যাবসুলিউট নির্ভুল দলিল বলি না।  তবে কেউ যতক্ষন চ্যালেঞ্জ না করে তথ্যের ভ্রান্তি ধরিয়ে দিচ্ছে ততক্ষন এটি প্রায় নির্ভুল।

সে রাতে বাড়ি ফিরছি।  মিটিং এর ফল শুন্য।  এটা জানাই ছিল।  হঠাতই আব্বা তাঁর দর্শন বাক্য আওড়াতে শুরু করলেন।  সে রাতে তিনি বললেন-Remember one thing- our father said that night.  To choose the right person ,the best one may not the perfect option always, the better may become the best sometimes…………….

আব্বা, ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাশ করা সাবেক কলেজ শিক্ষক।  এই একই লোক  কোন ঝুট ঝামেলা না থাকলে, ঘরে ভাল তরকারী থাকলে এই জীবনে তার তৃতীয় কোন চাওয়া নেই।  আংগুলের ফাকে সিগ্রেট গুঁজে, অন্য হাত দিয়ে সিগ্রেট গুঁজে রাখা হাতটা ঢেকে এমন জোরে সুখ টান দেয়, আমার রীতিমত লজ্জা লাগে।  আমি এত জোড়ে টান দিতে পারিনা।  টাকা পয়সা সংক্রান্ত অনটনে তার টিকিটিও দেখা যায় না। যদিও বা কোন দিন আমাদের ফাদে আটকা পরে তবে কেউ না কেউ তার বক্সিং হজম করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।  গাঁয়ে হাত তোলার ক্ষেত্রে স্থান, কাল, পাত্র কিংবা নারী পুরুষ অথবা বয়স তাঁর বিবেচনায় আসেনি কখনো।  আমি মনে মনে তাকে অশিক্ষিত ইতরের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন কখনো বোধ করিনি।  অশিক্ষিত বলার যথেষ্ট কারণ আছে।

এসবিসি/ জেডসি/এসবি