ভোটে দাঁড়াচ্ছেন শেখ রেহানা?

ভোটে দাঁড়াচ্ছেন শেখ রেহানা?

এস আই শফিক, বিশেষ প্রতিনিধি : বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সে ভাবনা আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ে এখনো প্রভাব ফেলেনি তেমন একটা। নিজেদের প্রস্তুতি নিতেই তৃণমূল নেতাকর্মীরা ব্যস্ত। মানুষের কাছে ভোট চাইছেন সবাই, কিছু আসনে অপেক্ষাকৃত নবীন তবে পরীক্ষিত নেতারা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।  দলীয় সুত্রে পাওয়া খবর, একশ’ ২০ আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে আছে, এইসব আসনে রয়েছেন হেভি ওয়েট নেতারা। এক কথায়, আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি এসব আসনে। একশ’র মতো নতুন মুখ আসবে নমিনেশন তালিকায়, যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা অন্য কোন সহযোগী সংগঠনে। তবে তিনশ’ আসনের হিসেব মেলানোর সময় আরও পরে, বিএনপি’র আসা না আসার ওপর নির্ভর করবে ১৪  দলীয় জোটের আসন ভাগের বিষয়টি। বিএনপি নির্বাচনে এলে আওয়ামী লীগ ২৩০ বা ২৩৫ আসনে নিজেদের প্রার্থী দেবে। বাকি আসন শরীক দলগুলোকে ছেড়ে দেবে।

আওয়ামী লীগের ভিভিআইপি আসন গোপালগঞ্জ-৩। এই আসন থেকে প্রার্থী হবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।   গোপালগঞ্জ-১ আসনে নতুন মুখ হিসেবে নাম রয়েছে শেখ রেহানার। রাজনীতিতে আসবেন না, এমন কথা অনেক আগে থেকে শোনা গেলেও এবার বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা নির্বাচনে আসবেন, এমন আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য কর্নেল (অব) ফারুক খান। শেখ রেহানা নির্বাচনে প্রার্থী হলে কর্নেল ফারুক খানকে রাজধানীর একটি আসন থেকে মনোনয়ন দেয়া হবে। আর গোপালগঞ্জ-২ আসনে শেখ ফজলুল করিম সেলিম থাকছেন।

সারাদেশে এখন যারা এমপি, তাদের দুচারজন বাদ পড়লেও পড়তে পারেন, তবে রানিং এমপিদের কেউ গুরুতর কোন অভিযোগ ছাড়া ছাঁটাই হওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার এসব আসনের অনেকগুলোতে নতুন প্রার্থীদের গণসংযোগ চলছে বেশ কয়েক মাস ধরে। এমপি না হলেও নিজ উদ্যোগে এলাকায় উন্নয়ন করেছেন, এমন নেতা আছেন বেশ কিছু আসনে। তারা দল ও জনগণের মন জয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। যতটা জানা গেছে, ২৯৮ আসনে রানিং এমপি ও নতুন মুখ মিলিয়ে অন্তত ৭শ’ মনোনয়ন প্রত্যাশী সক্রিয় আছেন মাঠে।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান, টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শক্তিশালী হয়েছেন। অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্থবিত্তেরও মালিক হয়েছেন। এসব নেতাকর্মীর অনেকে নিজ নিজ এলাকায় পৃথক বলয় তৈরি করে মনোনয়ন প্রত্যাশাও করছেন।

সুত্রমতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্যদের মতো বঞ্চিত নেতারাও নৌকার টিকেট পেতে গত কয়েক বছর যাবৎ নিজ নিজ এলাকায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে বিভিন্ন জরিপের ভিত্তিতে প্রার্থী তালিকা মোটামুটি চূড়ান্ত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারমধ্যে কিছু আসনের খবর জানা গেছে দলের দায়িত্বশীল সূত্রে।

জানা গেছে মাদারীপুর-১ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য নূরে আলম লিটন চৌধুরী ও মাদারীপুর-২ আসনে বর্তমান নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান একক প্রার্থী। মাদারীপুর-৩ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিমের সাথে সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম রয়েছে।

চাঁদপুর-৩ আসনে  শক্ত প্রাথী, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও বর্তমান এমপি ডাক্তার দীপুমনি। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। আবার আওয়ামী কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক, ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুজিৎ রায় নন্দী এবার জোরেশোরে মাঠে নেমেছেন। তার পক্ষে জেলায় বেশ শক্তিশালী একটা বলয় আছে। এরই মাঝে নমিনেশন চান একদম নতুন মুখ রেদওয়ান খান বোরহান।

চাঁদপুর – ৪ আসনে অনেক বছর ধরেই তৃনমূলে নিজের ভিত গড়েছেন ডাক্তার হারুনুর রশীদ সাগর। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগ করতেন, ভিপি ছিলেন চমেক ছাত্রসংসদের। পাস করার পর চাকরির সন্ধান না করে নিজের জেলায় প্র্যাকটিস করতে শুরু করেন দুই যুগ আগে। ফরিদগঞ্জে নিজের ব্যক্তিগত যে ইমেজ, নমিনেশন পেলে জয়ী হওয়ার দৃঢ় আশাবাদ তার।  বেশ কিছুদিন আগে এসবিসি৭১ এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, আমি চাঁদপুর-৪ ফরিদগঞ্জ আসন থেকে নির্বাচন করতে চাই। দল মনোনয়ন দিলে আমি এই আসনটি নেত্রীকে উপহার দিতে পারবো, ইনশাল্লাহ।’

বর্তমানে  শরীয়তপুর- ১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক। শরীয়তপুর-২ আসনে এক প্রার্থী হিসেবে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীমের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে দলের নিজস্ব টিমের প্তিরবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী। শরীয়তপুর-৩ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য প্রয়াত জননেতা আব্দুর রাজ্জাকের পুত্র নাহিম রাজ্জাক। ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান। ফরিদপুর-২ আসনে জাতীয় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। এই আসনে তার পরিবর্তে সাংবাদিক লায়েকুজ্জান মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন। ফরিদপুর-৩ আসনে এলজিআরডি মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন। ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ। রাজবাড়ী-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিম একক প্রার্থী। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে সংসদ সদস্য গাজী গোলাম দস্তগীর। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। মানিকগঞ্জ-২ আসনে মমতাজ বেগম ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে জাহিদ মালেক স্বপন মনোনয়ন পাচ্ছেন। মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে ডা. বদিউজ্জামান, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সম্পাদক এডভোকেট রানু আখতার।

ঢাকা-১ আসনে আব্দুল মান্নান খান, ঢাকা-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুল ইসলাম, ঢাকা-৩ আসনে সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ বিপু, ঢাকা-৪ আসনে সাবেক চেয়ারম্যান (তৃণমূলের নেতা হিসেবে পরিচিত) লুৎফর রহমান, ঢাকা-৫ আসনে মশিউর রহমান মোল্লা সজল, ঢাকা-৬ চৌধুরী আশিকুর রহমান লাভলু, ঢাকা-৭ আসনে ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন,  ঢাকা-৮ ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট,  আসনে মোজাফফর হোসেন পল্টু, ঢাকা-৯ আসনে সাবের হোসেন চৌধুরী, ঢাকা-১০ আসনে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস,  ঢাকা-১১ আসনে এ কে এম রহমতউল্লাহ,  ঢাকা-১২ আসনে আসাদুজ্জামান খান কামাল,  ঢাকা-১৩ আসনে জাহাঙ্গীর কবীর নানক ও ঢাকা-১৪ আসনে আসলামুল হক।

কিশোরগঞ্জ-১ আসনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম,  কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক,  কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে আজয়কর খোকন ও কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে নাজমুল আহসান পাপন। কিশোরগঞ্জ-২ আসনে ড. জায়েদ মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, গাজীপুর-১ আসনে মন্ত্রী আকম মোকাম্মেল হক,  গাজীপুর-২ আসনে  জাহিদ আহসান রাসেল,  গাজীপুর-৩ আসনে  বর্তমান সংসদ সদস্য রহমত আলীর পুত্র জামিল হাসান দুর্জয়।  গাজীপুর-৪ আসনে সিমিন হাসান রিমি,  গাজীপুর-৫ আসনে মেহের আফরোজ চুমকী। নরসিংদী-১ আসনে নজরুল ইসলাম হীরু,নরসিংদী-৪ আসনে নুরুল মজিদ হুমায়ুন।

পরিচ্ছন্ন ইমেজের এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবার দলের নমিনেশন চাইছেন।  তিনি ডঃ ওহিদুর রহমান টিপু। মাগুরা-২ আসন থেকে নমিনেশন প্রত্যাশা করেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল শাখার সভাপতি ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রথমবার সদস্য ও পরের বার সহ-সভাপতি ছিলেন। সরকার তাকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সহকারী হাই কমিশনার পদে নিয়োগ দিয়েছিল। সেখানে দায়িত্বপালন করে দেশে ফিরে পুরোদমে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন নির্বাচনী এলাকায়। এই মেধাবী নেতা ও আইনজীবী বর্তমানে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য। ছাত্রনেতা হিসেবে যেমন দুর্দান্ত ছিলেন, তেমনি সাফল্য দেখিয়েছেন কূটনীতিক হিসেবে। আবার আইন পেশায় অসাধারণ দক্ষতা তাকে মানুষের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম-১২ আসনে নমিনেশন প্রত্যাশা করছেন আওয়ামী যুবলীগের  কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুহম্মদ বদিউল আলম। সাবেক এ ছাত্রনেতা আন্দোলন সংগ্রামে সব সময় প্রথম সারিতে ছিলেন, প্রতিপক্ষের হামলা মোকাবেলা করে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছেন। ছাত্রলীগের পতাকা নিয়ে সুদীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মুহাম্মদ বদিউল আলম এখন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া আসন থেকে তিনি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। সেবার মনোনয়ন না পেলেও আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

ছাত্র রাজনীতির উত্তাল গর্ভে জন্ম নেয়া এই নেতার ভক্ত ও কর্মী-সমর্থকরা আশা করছেন, তার কর্মকাণ্ড ও অবদান বিবেচনা করে আসন্ন আওয়ামী লীগ তাকে পটিয়া (চট্টগ্রাম-১২) আসন থেকে মনোনয়ন দেবে।

আরও অনেকেই আগ্রহী এমপি হতে, তুমুল ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায়। শেষ অবধি কার ভাগ্যে নমিনেশন জুটবে, অবশ্যই সে সিদ্ধান্ত হবে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডে।

এসবিসি/এসআইএস/এসবি